আমার বাংলা ভাষা ইতিহাস

আমার বাংলা ভাষা ইতিহাস

ক্ষমতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অভিপ্রায়ে যে রাজনীতি—মানুষের সম্মিলিত প্রত্যাশা ও দাবির কাছে তা এক ফুঁয়ে উড়ে যায়। এই দাবি যে কখন দানা বেঁধে ওঠে তা ঝানু রাজনীতিবিদদের হিসেব নিকেশেও অনেক সময় ধরা পড়ে না। যেমনটি ধরা পড়েনি একুশে ফেব্রুয়ারির আন্দোলনের সময়।

সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ১৪৪ ধারা না ভাঙার সিদ্ধান্ত যখন সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গ্রহণ করল তখনই প্রমাণিত হলো যে, তারা রাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়েই বেশি চিন্তিত ছিলেন। সে কারণে মানুষের ইচ্ছা ও তাদের দাবির প্রতি নেতৃবৃন্দের চিন্তা কম ছিল। সে কারণেই সর্বদলীয় এই সিদ্ধান্ত কোনো ভাবেই মেনে নেয়নি ছাত্ররা। তারা আগে থেকেই মনে মনে প্রস্তুত ছিল এই ১৪৪ ধারা অমান্য করে তাদের দাবির তীব্রতা প্রকাশের জন্য।

এই ১৪৪ ধারার ভাঙার সিদ্ধান্ত তখন গ্রহণ করেছিল তিনটি পক্ষ। সাধারণ ছাত্ররা, যুবলীগের নেতা ও কর্মীরা এবং ছাত্র নেতাদের কয়েক জন, পৃথকভাবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে এসে। পরদিন অর্থ্যাত্ ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রসভায় এর যে প্রতিফলন ঘটেছিল তা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসেই শুধু নয় বাঙালি জাতির পরবর্তীকাল ও বর্তমানেও বাংলাদেশের যে কোনো আন্দোলন-সংগ্রামের জন্য প্রেরণাদায়ী ও গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষার অধিকার আদায়ের যে প্রস্তুতি ছাত্ররা ৪ ফেব্রুয়ারির পর থেকে চালাচ্ছিলেন, যে কর্মসূচি তারা গ্রহণ করেছিলেন তা ছিল নিয়মতান্ত্রিক। বরং মুসলিম আওয়ামী লীগ ও গুপ্ত কমিউনিস্ট পার্টি চেষ্টা করেছিল এই আন্দোলনের রাশ নিয়ন্ত্রণ করে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনের দিকে পরিচালিত করতে। কিন্তু তাদের চিন্তায় ভুল ছিল। তারা অনুধাবন করতে পারেননি মানুষ বিস্ফোরণের জন্য কী রকম উন্মুখ হয়ে আছে।

বাংলার যে কোনো আন্দোলনে এই বেঠকের কথা বারবার উচ্চারিত হয়ে আসছে। সেখানে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, যে কোনো মূল্যেই হোক, ১৪৪ ধারা ভাঙা হবে এবং তার জন্য কতগুলো কৌশল অবলম্বনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। ২০ ও ২১ ফেব্রুয়ারির গভীর রাতে ফজলুল হক হল আর ঢাকা হলের (বর্তমানে শহীদুল্লাহ হল) মাঝখানের পুকুরপাড়ে রচিত হয়েছিল আরেক ইতিহাস।যেহেতু আওয়ামী মুসলিম লীগ ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের একুশে ফেব্রুয়ারির ছাত্রসভায় সভাপতিত্ব করলে তিনি ১৪৪ ধারা ভাঙার বিরুদ্ধে মত দিতে পারেন এবং তাতে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতে পারে। তাই গাজীউল হককেই উক্ত আমতলার সভায় সভাপতিত্ব করতে হবে। তিনি যদি সভার আগেই গ্রেফতার হয়ে যান এম আর আখতার মুকুল সভাপতিত্ব করবেন, তিনি গ্রেফতার হলে কমরুদ্দিন শহুদ সভাপতিত্ব করবেন।

কি রকম একটা বিপদ-সংকেতের মতো শোনাচ্ছিল সরকারি গাড়ি থেকে ১৪৪ ধারা জারির সংবাদ-পরিবেশনটি। যখন শুনলাম সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছে তখন আমরা অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হই। … রাত ৯টা-১০টার সময় আমরা সাত-আট জন বন্ধুবান্ধব মিলিত হই ফজলুল হক হলের পূর্ব পাড়ে। সেদিনের সেই ঘটনা বিশদভাবে উঠে এসেছে বশীর আলহেলালের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে। সেখানে পুকুরপাড়ের সেই বৈঠকের বর্ণনা মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান করেছেন এভাবে, ‘২০ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যাটা আমার কাছে খুব থমথমে মনে হয়েছিল।

Share this news

Brinda Chowdhury
Author / Reporter

Brinda Chowdhury

Click the author name to read more stories.

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।