অপহরণ করে প্রকাশ্যে মুক্তিপণ নিচ্ছে জলদস্যুরা

বাঁশখালীর শেখেরবিল গ্রামের নিজ বাড়িতে বসে বোট মালিক সমিতির সভাপতি ইয়ার আলী বলছিলেন জলদস্যুদের স্পর্ধার কথা। সাগরে মাছ ধরার নৌকা জিম্মি করে দস্যুরা প্রকাশ্যে মুক্তিপণ নিতে আসে। মুক্তিপণ না দিলে মাছ ও জাল লুট করে। কখনো জেলেদের মারধর বা হত্যা করে।

এমন ঘটনায় গত এক মাসে বাঁশখালী থেকে নিখোঁজ হয়েছেন ২০ জেলে। এলাকাবাসীর ধারণা, জলদস্যুরা তাঁদের হত্যা করেছে। ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল ৩২ জন জেলেকে হত্যা করে লাশ সাগরে ফেলে দিয়েছিল জলদস্যুরা।

সাগরে জেলেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব উপকূলরক্ষী বাহিনী কোস্টগার্ডের। বোট মালিকেরা বলছেন, কোস্টগার্ডকে বলার পরও কোনো প্রতিকার হচ্ছে না। এ বিষয়ে কোস্টগার্ডের ভাষ্য, বিষয়টি তাদের জানা নেই।

সরেজমিনে বিভিন্ন সূত্রে কথা বলে জানা গেল, ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলো গভীর সমুদ্রে যখন মাছ ধরতে যায়, সুযোগ বুঝে জলদস্যুরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। এরপর জেলেসহ মাছ ধরার নৌকা অপহরণ করে জেলেদের মুঠোফোনের মাধ্যমে মুক্তিপণ দাবি করে। বাঁশখালীর জেলে ও নৌকার মালিকেরা বলছেন, কুতুবদিয়ার উপকূল এলাকা, বিশেষ করে রিমশাখালী, দুরুমবাজার এলাকায় জলদস্যুদের মূল আস্তানা।

বোট মালিক সমিতির সভাপতি ইয়ার আলী বলছিলেন জলদস্যুদের সঙ্গে তাঁদের প্রতিনিয়ত লড়াইয়ের কথা। তিনি দস্যুদের কায়দা-কৌশল তুলে ধরে বলেন, ‘জলদস্যুরা নৌকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মালিকদের ফোন দিয়ে বলে, আপনার বোট আমার হাতে। দুই লাখ টাকা দিন। তখন টাকা না দিলে মাছ, জাল নিয়ে যায়। জেলেদের হত্যা করে। এ অবস্থায় আপস না করে উপায় থাকে না।’

সম্প্রতি জলদস্যু রিমশাখালীর সিরাজের ছেলে মানিক ও নূর হোসাইনের ছেলে ছোট কালু প্রকাশ্যে মুক্তিপণ নিয়েছেন ইয়ার আলীর কাছ থেকে। 
গত ২৮ জুলাই ইয়ার আলী ফোনে জানালেন, জলদস্যুরা তাঁদের সমিতির চারটি নৌকা জিম্মি করে ৫০ জেলেকে অপহরণ করেছে। প্রতিটি নৌকা 
ছাড়ানোর জন্য দুই লাখ টাকা করে দাবি করছিল। পরে একটি নৌকা দেড় লাখ, একটি এক লাখ চার হাজার, দুটি ৬০ হাজার টাকা দিয়ে ছাড়াতে হয়েছে।

শশাঙ্ক জলদাস তাঁর তিন সন্তান নিখোঁজের কথা বলছিলেন। এক ছেলে দুই বছর আগে আর দুই ছেলে দুই মাসের মধ্যে নিখোঁজ হন। তিন সন্তানের ঘরেই স্ত্রী, দুটো-তিনটে করে ছেলেপুলে। কথা বলার সময় শশাঙ্ক ও তাঁর স্ত্রীর কণ্ঠে ঝরে পড়ছিল অসহায়ত্ব। তাঁর সঙ্গে কথা বলার সময় বিভিন্ন ঘর থেকে একে একে বেরিয়ে এল নারী, পুরুষ ও শিশুরা। চারপাশে অপুষ্টির শিকার শিশুদের আধিক্য। এই জলদাসপাড়ায় ঘর রয়েছে শ খানেক। আর লোকসংখ্যা ছয় শর ওপরে। গত এক মাসে ছয়জন জেলে নিখোঁজ হয়েছেন এই পাড়া থেকেই।

শশাঙ্ক বলছিলেন তিন পুত্রবধূ আর আটটি নাতি-নাতনি নিয়ে তাঁর কষ্টের দিনযাপনের কথা। ঘরে খাবার নেই। ওষুধপথ্য কেনার মতো টাকা নেই। এ সময় অনেকেই অনুরোধ জানালেন তাঁদের ঘরে যাওয়ার জন্য। কেউ নিখোঁজ সন্তান, কেউ স্বামীর জাতীয় পরিচয়পত্র তুলে ধরে তাঁদের খুঁজে পেতে সাহায্য চাইলেন।

জেলেজীবন

সাগরে এখন পাওয়া যাচ্ছে লইট্টা, ইলিশ, ওদারা বেলেসহ আরও কিছু মাছ। যে সময়ে যে এলাকায় মাছ পাওয়া যায়, জেলে নৌকা সেদিকেই যায়। এখন মাছ মিলছে কুয়াকাটার দিকে। বাঁশখালীর উপকূল থেকে একটা ইঞ্জিনচালিত নৌকার কুয়াকাটা পৌঁছাতে ২২ ঘণ্টার মতো লাগে। সাধারণত ১৫ দিনের রসদ নিয়ে সাগরে নামেন জেলেরা। প্রত্যাশামতো মাছ পেলে আগেই ফিরে আসেন। একটি নৌকায় থাকে ১৮-২০ জন জেলে। আর একজন থাকেন প্রধান মাঝি।

বোট মালিক সমিতির তথ্যমতে, একটা নৌকা সাগরে নামাতে চার লাখ টাকার মতো খরচ হয়। সে ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকার মাছ না পেলে পোষায় না। বোট মালিক ও জেলেরা জানালেন, সাগরে জেলেদের এই মুহূর্তে আরেকটি বড় সমস্যা ভারতীয় মাছ ধরার নৌকাগুলোর তৎপরতা। ভারতীয় নৌকাগুলো ১০০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত ভেতরে ঢুকে মাছ ধরে নিয়ে চলে যায়। কিন্তু তাদের থামাতে কোস্টগার্ডের ভূমিকা খুব সীমিত।

কোস্টগার্ড যা বলছে

বাঁশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় জেলে অপহরণ করে প্রকাশ্যে মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের লেফটেন্যান্ট (অপারেশন) মোহাম্মদ আলাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের কেউ জানায়নি। বাঁশখালী থানাকে আমরা বলেছি, এ রকম মুক্তিপণ আদায়ের কোনো খবর থাকলে আমাদের যেন জানানো হয়। তাহলে আমরা নদীপথে সহায়তা করতে পারব।’

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে নিখোঁজ বা নিহত জেলেদের কোনো তালিকা নেই। মৎস্য কর্মকর্তা আলতাফ হোসেন বলেন, মারা যাওয়া কিছু জেলের পরিবার সরকারি সহায়তার আবেদন করেছিল, সেই তালিকা আছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।