প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০ অনুযায়ী কোনো পুকুর বা জলাশয়ের স্বাভাবিক চরিত্র পরিবর্তন কিংবা ভরাট করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
উচ্চ আদালতের পরিষ্কার রায় রয়েছে, ব্যক্তিমালিকানাধীন পুকুর বা জলাশয়ও চাইলেই ভরাট করা বা তার শ্রেণি পরিবর্তণ করা যাবে না। কিন্তু এই সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মালিকানাধীন একটি পুকুর ব্যক্তিগত টাকায় ভরাটের অভিযোগ উঠেছে এক ইউপি চেয়ারম্যান ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে। মাদারীপুর সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের ৪৬নং চরনাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঘটে এ ঘটনা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ৪৬নং চরনাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোলঘেঁষে থাকা প্রায় ৪০ শতাংশ জমির পুরো পুকুরটি বিদ্যালয়ের সম্পত্তি। কিন্তু সদর উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফায়েকুজ্জামান বাবুল ও ৪৬নং চরনাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়ার জোগসাজোশে গত একসপ্তাহ ধরে দিনের আলোতে প্রকাশ্যে ভরাট করা হয়েছে।
সরকারিভাবে একটি প্রকল্প অনুমোদন করার চেষ্টা করলে ব্যর্থ হয় ইউপি চেয়ারম্যান। সেই প্রকল্পের আশায় ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে পুকুরটি ভরাট করে ফেলেন। যা পরবর্তীতে সরকারি অর্থ থেকে সমন্বয় করার এখনও পায়তারা করছেন ইউপি চেয়ারম্যান। সরকারি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে পুকুরটি ভরাট করায় পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিদ্যালয়ের পুকুরটির পানি গোসল করা থেকে শুরু করে নানা কাজে ব্যবহার করে আসছিলেন এলাকাবাসী। পুকুরটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ায় আশপাশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
এলাকার অগ্নিকান্ডেও ব্যাপক ভূমিকা রাখতো পুকুরটি। কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহার করে ইউপি চেয়ারম্যান স্কুলের জমিতে থাকা পুকুরটি ভরাট করেছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করলে মামলা-হামলার ভয় দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরসাথে এক ইউপি সদস্যও জড়িত রয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘটনায় জড়িতদের বিচার দাবী করেছেন স্থানীয়দের পাশাপাশি সচেতন মহল। স্থানীয় পরিবেশভিত্তিক সংগঠন ফ্রেন্ডস্ধসঢ়; অব নেচার-এর নির্বাহী পরিচালক রাজন মাহমুদ বলেন, ‘পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় পুকুর বাঁচিয়ে রাখতে সবার এগিয়ে আসতে হবে। জলায়শ বা পুকুর ভরাট করা গুরুতর অপরাধ। এই ঘটনায় জড়িতদের দৃশ্যমান বিচার হওয়া উচিৎ। সবাইকে
আইনের আওতায় আনতে সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতরকে অনুরোধ করছি। পাশাপাশি ভরাট করা পুকুরটিকে পুনঃখনন করে আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার দাবি করছি।’ মাদারীপুর উন্নয়ন সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অ্যাডভোকেট মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘পুকুরটি ভরাটের পেছনে অবশ্যই কোন অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে। তা না হলে ইউপি চেয়ারম্যান তার ব্যক্তিগত অর্থ দিয়ে পুকুরটি ভরাট করতেন না।
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভরাটকৃত পুকুরটির বালু অপসারণের দাবি জানাচ্ছি।’ অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফায়েকুজ্জামান বাবুল বলেন, ‘সরকারি প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার কথা। কিন্তু সেটি বাস্তবায়ন হয়নি। জনস্বার্থে ব্যক্তিগত তহবিল থেকে স্কুলের পুকুরটি ভরাট করেছি। এতে খরচ প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এটা নিয়ে তো কারো কোন আপত্তি থাকার কথা নয়।’
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সুমন মিয়া বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান ফায়েকুজ্জামান বাবুল পুকুরটি ভরাট করেছেন। তিনিই ভালই জানবেন। আমার কাছে পুকুর ভরাট করার কোন অনুমতিপত্র নেই। এটি ভরাট করে খেলার মাঠ বাড়ানো হবে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলার মান উন্নয়নে পুকুরটি ভরাট করতে দেয়া হয়েছে।’
মাদারীপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জাকিয়া সুলতানা বলেন, ‘উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। এরইমধ্যে জেলা প্রশাসক মহোদয়ের নলেজে বিষয়টি রয়েছে। আমরা দোষিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবো।’
মাদারীপুরের জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফজলে এলাহী বলেন, ‘শিক্ষক চাইলেই স্কুলের পুকুর ভরাট করতে পারে না। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা অধিদফতরের একজন সহকারি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে তদন্তের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
স্থানীয় সরকার বিভাগের মাদারীপুরের উপ-পরিচালক জেসমিন আক্তার বানু বলেন, ‘ইউপি চেয়ারম্যান কোন অবস্থাতেই বিদ্যালয়ের পুকুর ভরাট করতে পারেন না। খোঁজ-খবর নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে।’




