কিশোরগঞ্জ: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য, গুজব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট মোকাবিলায় সাংবাদিকদের আরও সচেতন ও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, সরকারের কোনো ভুল-ত্রুটি থাকলে সাংবাদিকদের অবশ্যই তা তুলে ধরতে হবে। তবে তথ্য যাচাই না করে অপপ্রচার বা অপতথ্যের মাধ্যমে নয়। সাংবাদিকদের ফ্যাক্টচেকিং, এআই প্রযুক্তি এবং মিসইনফরমেশন সম্পর্কে দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলায় সাংবাদিকদের জন্য আয়োজিত মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতা, ফ্যাক্টচেকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক তিন দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষে সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু সাংবাদিকদের হাতে একটি সনদ তুলে দেওয়া নয়। ফ্যাক্টচেকিংয়ের পাশাপাশি ডিসইনফরমেশন ও মিসইনফরমেশন শনাক্ত এবং মোকাবিলায় সাংবাদিকদের সক্ষম করে তোলাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের অপতথ্য যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা প্রতিরোধে গণমাধ্যমকর্মীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় ও পরিচিত ব্যক্তিদের নামে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এমনকি নারী ও শিশুদেরও মিসইনফরমেশন ও পরিচয় জালিয়াতির মাধ্যমে হেয়প্রতিপন্ন করার ঘটনা ঘটছে, যা মানবাধিকারের জন্য উদ্বেগজনক।
ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, অপতথ্য ছড়ানোর সঙ্গে শুধু পেশাদার সাংবাদিকরাই জড়িত—বিষয়টি এমন নয়। অনেকেই সাংবাদিক না হয়েও নিজেদের সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে গুজব ও অসত্য তথ্য প্রচার করছেন। আবার এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে মানুষের ছবি বিকৃত করে ভিডিও তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে পেশাদার ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকদের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
প্রকৃত সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য আরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুই বছর মেয়াদি মাস্টার্স কোর্স এবং এআইভিত্তিক সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন ধরনের প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রেস ক্লাবগুলোর মাধ্যমে প্রকৃত সাংবাদিকদের তালিকা সংগ্রহ করে পর্যায়ক্রমে তাদের প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে।
সাংবাদিকদের কল্যাণে সরকারি সহায়তা বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও জানান তিনি। সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে ইতোমধ্যে বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। সাংবাদিকদের জন্য এ সহযোগিতা আরও সম্প্রসারণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করা হয়েছে এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
নিজের দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকার প্রসঙ্গে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, তিনি শুধু ময়মনসিংহ বিভাগের মন্ত্রী নন, পুরো বাংলাদেশের মন্ত্রী। তাই মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম সারা দেশের মানুষের জন্য। তবে নিজের এলাকার মানুষের প্রতি কিছুটা বাড়তি দায়িত্ববোধ থাকা স্বাভাবিক।
তিনি জানান, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের প্রথম ধাপে ময়মনসিংহ বিভাগ, বগুড়া, ফেনী এবং ঢাকার আশপাশের বিভিন্ন জেলায় কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও এ ধরনের প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণ করা হবে।
দেশের উন্নয়ন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকার বাস্তবতার বাইরে গিয়ে কোনো প্রতিশ্রুতি দিতে চায় না। কয়েক বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে অন্য কোনো দেশের মতো বানিয়ে দেওয়ার অবাস্তব আশ্বাস নয়, বরং দেশের মানুষের জীবনমান ও সামগ্রিক পরিস্থিতির উন্নয়নে বাস্তবসম্মতভাবে কাজ করাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সবার। রাজনীতিবিদ, প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, সাংবাদিকসহ সমাজের প্রতিটি মানুষেরই দেশের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। সাংবাদিকরা জনগণের কথা তুলে ধরার পাশাপাশি সরকারের ভুল-ত্রুটিও প্রকাশ করবেন। তবে সেই সাংবাদিকতা অবশ্যই হতে হবে তথ্যনির্ভর, যাচাই করা এবং দায়িত্বশীল।
গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশে গণমাধ্যমের যে স্বাধীন পরিবেশ রয়েছে, তা অব্যাহত থাকবে।
রাষ্ট্র ও গণতন্ত্রের স্বার্থে সাংবাদিকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অতীতে রাষ্ট্র ও অর্থনীতিকে দুর্বল করে দেওয়ার যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তা যেন আর ফিরে না আসে এবং দেশে গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকে—এ বিষয়ে সাংবাদিকদেরও সচেতন থাকতে হবে।
হোসেনপুরসহ কিশোরগঞ্জের উন্নয়ন প্রসঙ্গে ইয়াসের খান চৌধুরী বলেন, সরকারের নেওয়া উন্নয়ন কর্মসূচিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে। জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী হিসেবে তিনি স্থানীয় মানুষের পাশে থাকারও আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মুকিত সরকার, হোসেনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেকসোনা খাতুন, হোসেনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মুহাম্মদ রাশেদুল ইসলামসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা, সাংবাদিক এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

