শুধু সংখ্যালঘু হলেই ছাড় নয়: সাম্পা সরকার মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায়

শুধু সংখ্যালঘু হলেই ছাড় নয়: সাম্পা সরকার মামলায় কলকাতা হাইকোর্টের রায়
সাম্পা সরকার মামলা

বাংলাদেশের খুলনার এক হিন্দু নারী সাম্পা সরকারকে ঘিরে করা মামলায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, ভারতে অবস্থানের ক্ষেত্রে Immigration and Foreigners (Exemption) Order, 2025-এর সুবিধা দাবি করলেই তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রযোজ্য হবে না। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে প্রমাণ করতে হবে যে তিনি ওই আইনি ছাড় পাওয়ার শর্ত পূরণ করেন। শুধু সংখ্যালঘু হলেই ছাড় নয়

৬ মে ২০২৬ তারিখে বিচারপতি ড. অজয় কুমার মুখার্জি সাম্পা সরকারের করা ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিলের আবেদন খারিজ করেন। আদালত একই সঙ্গে স্পষ্ট করেছে, তিনি ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার কি না বা ভারতে আশ্রয়ের জন্য সেই কারণে বাধ্য হয়েছিলেন কি না—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বিচার চলাকালেই নেওয়া হবে।

কী ঘটেছিল সাম্পা সরকারের ক্ষেত্রে?

আদালতের নথি অনুযায়ী, ২৭ বছর বয়সী সাম্পা সরকার বাংলাদেশের খুলনা জেলার বাসিন্দা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্য। তিনি ৭ ডিসেম্বর ২০২৪ বৈধ বাংলাদেশি পাসপোর্ট ও ভিসা নিয়ে ঘোজাডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। তাঁর ভিসার মেয়াদ ছিল ৬ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত।

ভারতে যাওয়ার পর তিনি এক ভারতীয় নাগরিককে বিয়ে করেন এবং সেখানেই অবস্থান করতে থাকেন। পরবর্তীতে তিনি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগ করেন।

আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে Immigration and Foreigners Act, 2025-এর ২১ ধারায় মামলা করা হয়। ওই ধারায় বৈধ পাসপোর্ট, ভিসা বা প্রয়োজনীয় ভ্রমণ নথি ছাড়া ভারতে প্রবেশের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে।

কেন তিনি আইনি ছাড়ের দাবি করেছিলেন?

সাম্পা সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, তিনি এমন একটি শ্রেণির মানুষ, যাদের জন্য ভারত সরকার বিশেষ ছাড় দিয়েছে।

Immigration and Foreigners (Exemption) Order, 2025-এর Order 3(e) অনুযায়ী, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পারসি ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের এমন ব্যক্তিরা, যারা ধর্মীয় নিপীড়ন বা নিপীড়নের আশঙ্কায় ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন এবং ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪ বা তার আগে ভারতে প্রবেশ করেছেন, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা না থাকলেও কিংবা এসব নথির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও ছাড় পেতে পারেন।

সাম্পার আইনজীবীর যুক্তি ছিল, তিনি হিন্দু, বাংলাদেশ থেকে এসেছেন এবং নির্ধারিত সময়সীমার আগেই ভারতে প্রবেশ করেছেন। উপরন্তু, তদন্তে তাঁর ভিসা ও ভারতে প্রবেশের তারিখও যাচাই করা হয়েছিল।

আদালত কেন আবেদন খারিজ করল?

রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য ছিল, সাম্পা সরকার সাধারণ টুরিস্ট ভিসায় ভারতে প্রবেশ করেছিলেন। ভারতে প্রবেশের সময় কিংবা পরবর্তী সময়ে তিনি ধর্মীয় নিপীড়নের কারণে ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন—এমন দাবি করেননি। ফৌজদারি মামলা শুরু হওয়ার পর এই দাবি সামনে এসেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ এটিকে ‘afterthought’ বা পরে তৈরি করা দাবি হিসেবে প্রশ্ন তোলে।

এই অবস্থায় হাইকোর্ট বলেছে, শুধু আইনের একটি ধারার উল্লেখ করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ছাড়ের অধিকারী হয়ে যান না। তাঁকে ধর্মীয় নিপীড়নের ভয় বা নিপীড়নের বাস্তব পরিস্থিতি প্রমাণ করার মতো উপাদান উপস্থাপন করতে হবে।

প্রমাণের দায় কার?

মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি দিকটি এসেছে Immigration and Foreigners Act, 2025-এর ১৬ ধারা থেকে।

এই ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি নির্দিষ্ট শ্রেণির বিদেশি কি না—এমন প্রশ্ন উঠলে, সেই ব্যক্তি যে সংশ্লিষ্ট শ্রেণির বিদেশি নন বা নির্দিষ্ট আইনি অবস্থানের অধিকারী, তা প্রমাণের দায় তাঁর ওপরই থাকবে। আদালত এই বিধানকে মামলার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

অর্থাৎ, সাম্পা সরকারের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি শুধু তিনি হিন্দু কি না—তা নয়। তাঁকে দেখাতে হবে যে ধর্মীয় নিপীড়ন বা তার আশঙ্কার কারণে তিনি ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিলেন, যাতে Exemption Order-এর নির্দিষ্ট শর্ত তাঁর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হয়।

কী ধরনের প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে?

আদালতের পর্যবেক্ষণে ধর্মীয় নিপীড়নের দাবি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কয়েক ধরনের প্রমাণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • নিপীড়নের বিষয়ে বিস্তারিত ও বিশ্বাসযোগ্য ব্যক্তিগত বক্তব্য;
  • পুলিশ রিপোর্ট বা অভিযোগ;
  • চিকিৎসা সংক্রান্ত নথি;
  • হুমকির চিঠি বা বার্তা;
  • আঘাতের ছবি বা অন্যান্য প্রমাণ;
  • ধর্মীয় পরিচয় গোপন করতে বাধ্য হওয়ার পরিস্থিতি;
  • ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্য বা আইনগত বৈষম্যের প্রমাণ;
  • ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে চাকরি বা জীবিকার ক্ষতির প্রমাণ।

তবে আদালত এসবকে কোনো বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ তালিকা হিসেবে নির্ধারণ করেনি; বরং ধর্মীয় নিপীড়নের ভয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে কী ধরনের বিশ্বাসযোগ্য সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিবেচনায় আসতে পারে, তার উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

আদালতের পর্যবেক্ষণের আসল তাৎপর্য

এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কলকাতা হাইকোর্ট সাম্পা সরকার ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার নন—এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি। আদালত বলেছে, তাঁর দাবি সত্য কি না, তা প্রমাণ ও শুনানির মাধ্যমে বিচার করতে হবে। তাই হাইকোর্টের পর্যায়ে ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিল করার প্রয়োজন নেই।

আদালত আরও উল্লেখ করেছে, ২০২৫ সালের আইন আগের Foreigners Act, 1946 বাতিল করলেও প্রমাণের দায়সংক্রান্ত বিধান বহাল রেখেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কোনো বিশেষ ছাড়ের আওতায় পড়েন কি না, সেই প্রশ্নে তাঁর নিজের দাবি ও প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশি সংখ্যালঘুদের জন্য এর অর্থ কী?

মামলাটি বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে কারণ এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ভারতের ২০২৫ সালের Exemption Order-এর বাস্তব প্রয়োগের একটি উদাহরণ পাওয়া যাচ্ছে।

তবে এই রায়কে “ভারতে থাকা সব বাংলাদেশি হিন্দু সংখ্যালঘু আইনি ছাড় থেকে বঞ্চিত”—এমন অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না। বরং আদালতের বক্তব্য হলো, ছাড়টি নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষ এবং কেউ সেই সুবিধা দাবি করলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণের বিষয়টি প্রমাণ করতে হবে।

একইভাবে, এই রায়কে বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের ধর্মীয় নিপীড়নের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো সাধারণ সিদ্ধান্ত হিসেবেও দেখা যায় না। আদালত সাম্পা সরকারের ব্যক্তিগত দাবির সত্যতা বিচার করার জন্য বিষয়টি ট্রায়ালের পর্যায়ে রেখেছে।

মামলার সারসংক্ষেপ

মামলা: Sampa Sarkar vs. The State of West Bengal & Anr.
মামলা নম্বর: CRR 1121 of 2026
আদালত: কলকাতা হাইকোর্ট
রায়ের তারিখ: ৬ মে ২০২৬
বিচারপতি: ড. অজয় কুমার মুখার্জি
মূল আইন: Immigration and Foreigners Act, 2025
গুরুত্বপূর্ণ ধারা: ৩, ১৬, ২১, ২৩, ৩৩
বিশেষ বিধান: Immigration and Foreigners (Exemption) Order, 2025-এর Order 3(e)
ফলাফল: ফৌজদারি কার্যক্রম বাতিলের আবেদন খারিজ; বিষয়টি বিচারে নিষ্পত্তির জন্য বহাল।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।