প্রায় ৭২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক উচ্চতায় ভারত

প্রায় ৭২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক উচ্চতায় ভারত
ভারতের অর্থনীতি আবারও এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে পরিসংখ্যান নিজেই কথা বলছে। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা ভান্ডার বা ফরেক্স রিজার্ভ পৌঁছে গেছে প্রায় ৭২৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ঐতিহাসিক উচ্চতায়। এই অঙ্ক শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং এটি ভারতের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, নীতিগত দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রতিফলন।
Reserve Bank of India-এর প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র এক সপ্তাহে ফরেক্স রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ১৪ বিলিয়ন ডলার এবং তিন সপ্তাহে মোট বৃদ্ধি প্রায় ৩৬ বিলিয়ন ডলার। সাধারণত এত স্বল্প সময়ে এই ধরনের লাফ খুব কম দেশেই দেখা যায়। আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, এই বৃদ্ধির সময়েই কেন্দ্রীয় ব্যাংক ধাপে ধাপে ডলারের উপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। বিদেশি মুদ্রা সম্পদের অংশ কিছুটা কমলেও মোট রিজার্ভ কমেনি, বরং বেড়েছে।
এর মূল কারণ দুটি জায়গায় স্পষ্ট। প্রথমত, আরবিআইয়ের কৌশলগত কারেন্সি সোয়াপ নীতি। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় স্বল্পমেয়াদি ডলার ও রুপির আদানপ্রদান করা হয়, যাতে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং রিজার্ভের কাঠামো আরও শক্তিশালী হয়। দ্বিতীয়ত, সোনার রিজার্ভ। গত এক-দুই বছরে আরবিআই ধারাবাহিকভাবে সোনা সংগ্রহ করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামের বৃদ্ধি সেই সোনার মূল্য বাড়িয়ে দিয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ফরেক্স রিজার্ভের মোট অঙ্কে।
ফরেক্স রিজার্ভের এই শক্ত ভিতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি বড় খবর। আরবিআই চলতি অর্থবর্ষের জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস আবারও বাড়িয়েছে। সর্বশেষ সংশোধনে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে প্রায় ৭.৪ শতাংশ। এক সময় যেখানে এই সংখ্যা ৬.৮ বা ৬.৯ শতাংশের আশেপাশে ঘোরাফেরা করছিল, সেখানে এখন এই সংশোধন স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে যে বাস্তব অর্থনীতি প্রত্যাশার চেয়েও ভালো পারফর্ম করছে।
এই মূল্যায়নের সঙ্গে সুর মিলিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিও। International Monetary Fund-এর সাম্প্রতিক অনুমানেও ভারতের প্রবৃদ্ধি একই রকম উচ্চ পর্যায়ে থাকার কথা বলা হয়েছে। শুধু চলতি বছর নয়, আগামী অর্থবর্ষের প্রথম দুই ত্রৈমাসিকের জন্যও শক্তিশালী বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বাস্তব ভিত্তি রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা শক্তিশালী হয়েছে, বিশেষ করে ব্যক্তিগত ভোগব্যয় বেড়েছে। মানুষের হাতে খরচ করার মতো আয় বেড়েছে, যা সরাসরি বাজারে চাহিদা তৈরি করছে। অবকাঠামো ও পরিষেবা খাতে বিনিয়োগের গতি এখনও অটুট। পরিষেবা খাত ঐতিহ্যগতভাবেই ভারতের শক্তি, আর কৃষিখাতও আবহাওয়ার অনুকূলতার কারণে স্থিতিশীল অবদান রেখে চলেছে।
এই সবকিছু মিলিয়ে ভারত আজ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলির তুলনায় একেবারে আলাদা জায়গায় দাঁড়িয়ে। যেখানে উন্নত দেশগুলির প্রবৃদ্ধি ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে ভারত ৭ শতাংশের বেশি হারে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন কিংবা ব্রিকসের অন্যান্য দেশ—সব ক্ষেত্রেই ভারতের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।
এই ছবিটা আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে যখন এর সঙ্গে মূল্যস্ফীতির তথ্য যুক্ত হয়। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর সময়কালে ভারতের গড় খুচরো মূল্যস্ফীতি নেমে এসেছে প্রায় ১.৭ শতাংশে। ভোক্তা মূল্য সূচক চালু হওয়ার পর এত কম গড় মূল্যস্ফীতি আগে কখনও দেখা যায়নি। আরবিআইয়ের নির্ধারিত ২ থেকে ৬ শতাংশের লক্ষ্যসীমারও নিচে রয়েছে এই সংখ্যা।
বিশ্বের অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে এই চিত্র আরও স্পষ্ট হয়। যেখানে অনেক দেশে মূল্যস্ফীতি এখনও ৪ থেকে ৬ শতাংশের মধ্যে ঘোরাফেরা করছে, সেখানে ভারতের মূল্যস্ফীতি কার্যত বহু বছরের নিম্নস্তরে। এর মানে হলো, প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু দাম নিয়ন্ত্রণে রয়েছে—যা যে কোনো অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সমীকরণ।
এই সমস্ত উপাদান একসঙ্গে মিলিয়ে ভারতের অর্থনীতি এখন এক বিরল অবস্থানে। একদিকে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি, অন্যদিকে নিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি, তার সঙ্গে বিপুল ফরেক্স রিজার্ভ যা প্রায় এক বছরের আমদানি ব্যয় নির্বিঘ্নে সামলাতে সক্ষম। এই তিনের সমন্বয় বিশ্ব অর্থনীতিতে খুব কম দেশই একসঙ্গে ধরে রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে বর্তমান চিত্র স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারতের ম্যাক্রো-অর্থনৈতিক ভিত্তি এখন দৃঢ়। নীতিগত স্থিরতা, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সক্রিয় ভূমিকা এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক শক্তি মিলিয়ে ভারত এমন এক জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তাও তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Kishori
লেখক / প্রতিবেদক

Kishori

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।