হাম ও ডেঙ্গুর দ্বৈত আতঙ্কে দেশ। দেশজুড়ে এখন হাম ও ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একদিকে শিশুদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে বৃষ্টি ও অনুকূল আবহাওয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ—দুই ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা।
অনেক অভিভাবক বলছেন, ঘরের মধ্যে রেখে শিশুদের হাম থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেওয়া গেলেও ডেঙ্গু থেকে রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের ভাষ্য, প্রয়োজনীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া অনেক সময় তাদের সামর্থ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। অন্যদিকে চলমান বর্ষা ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে, ফলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যাও ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
হাম প্রতিরোধে সরকার বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি ও ভিটামিন-এ ক্যাম্পেইন পরিচালনা করলেও এখনো অনেক শিশু টিকার আওতার বাইরে রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। ফলে টিকা না নেওয়া শিশুরাই বেশি আক্রান্ত হচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে বুধবার সকাল পর্যন্ত দেশে সন্দেহজনক হাম রোগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে ৯৯ হাজার ২৯৪ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন।
গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে ৯০৪ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগী পাওয়া গেছে ১৩৩ জন। এ সময়ে হামজনিত উপসর্গে মৃত্যু হয়েছে ৬ শিশুর। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সন্দেহজনক হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৭০৮ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যুর সংখ্যা ৯৫ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে নতুন করে হামে আক্রান্তের হার কিছুটা কমলেও আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পরবর্তী জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অনেক শিশু হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পর নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন সমস্যায় আবার হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. আতিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হাম থেকে সুস্থ হওয়ার পর অনেক শিশুর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। ফলে তারা দ্বিতীয়বার সংক্রমণের শিকার হয়। এসব জটিলতা অনেক সময় মারাত্মক আকার ধারণ করছে।
অন্যদিকে দেশে ডেঙ্গুর সংক্রমণও ক্রমেই বাড়ছে। চলতি বছর এ পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১১ হাজার ৫৭০ জন। এর মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩৮ জনের।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ঘন ঘন বৃষ্টি ও উষ্ণ আবহাওয়ার কারণে এডিস মশার বংশবিস্তার বেড়েছে। ফলে আগামী আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, মে থেকে জুন এবং জুন থেকে জুলাই—প্রতিটি মাসেই ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে। চলমান বৃষ্টির কারণে মশার প্রজনন ক্ষেত্র বাড়ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, বাসাবাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত প্লাস্টিক সামগ্রীসহ যেসব স্থানে পানি জমে থাকে, সেগুলো দ্রুত অপসারণ করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মশারি টানিয়ে ঘুমানো এবং ফুলহাতা জামা ও প্যান্ট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
মন্ত্রী বলেন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের পাশাপাশি এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সরকার ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে লার্ভা ধ্বংস, ফগিং কার্যক্রম, হাসপাতালগুলোতে স্যালাইন সরবরাহ এবং ডিসেম্বর পর্যন্ত বিনামূল্যে ডেঙ্গু পরীক্ষা সুবিধা চালু রেখেছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন, জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে রোগের ধরন নিশ্চিত করে চিকিৎসা নিতে হবে।
তারা বলছেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশা ও এর প্রজননস্থল ধ্বংসে রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত সমন্বিত কার্যক্রম চালানো জরুরি। অন্যথায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।