বাবার বেকারত্ব, মায়ের ত্যাগ—সংগ্রাম করে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল যমজ বোন

বাবার বেকারত্ব, মায়ের ত্যাগ—সংগ্রাম করে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল যমজ বোন
বাবার বেকারত্ব, মায়ের ত্যাগ—সংগ্রাম করে এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পেল যমজ বোন

অভাব-অনটনের সংসার। বাবা বেকার, পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে দুই মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়াই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। তবু দমে যাননি তারা।

মায়ের নিরলস পরিশ্রম, শিক্ষকদের সহযোগিতা ও উপবৃত্তির সহায়তায় সব বাধা পেরিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে যমজ বোন রহিমা সরদার ও রাবেয়া সরদার। অবশেষে ২০২৬ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করে নিজেদের মেধার পরিচয় দিয়েছে তারা।

রহিমা ও রাবেয়া কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের রামকার্জি গ্রামের বাসিন্দা। তারা রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের শিক্ষার্থী।

কলেজ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর প্রতিষ্ঠানটি থেকে ১৪২ জন শিক্ষার্থী এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছে মাত্র দুজন। আর দুজনই যমজ বোন রহিমা ও রাবেয়া। উপজেলার সাতটি কলেজ, তিনটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানসহ মোট ১৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে তারাই একমাত্র জিপিএ-৫ অর্জনকারী বলে জানা গেছে।

তবে এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের ত্যাগ ও কঠিন সংগ্রাম। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ছোট দুই মেয়েকে নিয়ে বাবা মনির হোসেন সরদার রিজু ও মা নাসিমা বেগমের সংসার। বাবার বেকারত্বের কারণে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সংকটে রয়েছে। সীমিত আয়ে দুই মেয়ের পড়াশোনার খরচ বহন করা ছিল বেশ কঠিন। তারপরও মেয়েদের শিক্ষাজীবন যেন থেমে না যায়, সে জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন মা-বাবা।

সংসারের অভাবের মধ্যেও দুই বোনের পাশে দাঁড়িয়েছেন কয়েকজন শিক্ষক ও কলেজ কর্তৃপক্ষ। প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার তাদের মধ্যে একজনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন। অন্যদিকে, কলেজ কর্তৃপক্ষ ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আর্থিক সহযোগিতা করেছে। পাশাপাশি উপবৃত্তিও পেয়েছে তারা। এসব সহায়তা তাদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পথ সহজ করেছে।

দুই মেয়ের এমন ফলাফলে আনন্দিত ও আবেগাপ্লুত মা নাসিমা বেগম। তিনি বলেন, “আমার স্বামী বেকার। অনেক কষ্ট করে মেয়েদের লেখাপড়া করিয়েছি। প্রাইভেট শিক্ষক মোসলেম উদ্দিন, আহসান হাবিব ও সোহেল স্যার দুই বোনের মধ্যে একজনকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়িয়েছেন।

কলেজের অধ্যক্ষ স্যার ভর্তি, ফরম পূরণসহ বিভিন্ন পরীক্ষার ক্ষেত্রে নামমাত্র টাকা নিয়েছেন। এ ছাড়া তারা উপবৃত্তিও পেয়েছে। সবার সহযোগিতা না পেলে হয়তো মেয়েদের পক্ষে এত ভালো ফল করা সম্ভব হতো না।”

নিজেদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে রহিমা ও রাবেয়া জানায়, বাবার কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করা এবং নিজেদের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যেই তারা ভালো ফলের জন্য পরিশ্রম করেছে। কলেজে যাতায়াত ও খাওয়াদাওয়ার সময় বাদে দিনের প্রায় পুরোটা সময় পড়াশোনায় ব্যয় করত তারা। এমনকি ঘুমানোর সময়ও ছিল সীমিত। এখন তাদের লক্ষ্য ভালো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা। সে জন্য প্রস্তুতিও শুরু করেছে দুই বোন।

রাজারহাট সরকারি মীর ইসমাইল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মুহা. জহুরুল ইসলাম বলেন, “রাজারহাট উপজেলার ১৪টি কলেজের মধ্যে এই যমজ দুই বোনই মানবিক শাখা থেকে জিপিএ-৫ অর্জন করেছে। তাদের এ অসাধারণ সাফল্যে আমরা আনন্দিত।”

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।