প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে: হুমায়ুন কবির

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে: হুমায়ুন কবির
প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরে উন্নয়ন ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে: হুমায়ুন কবির

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশে উন্নয়ন সহযোগিতা, বেসরকারি বিনিয়োগ ও মানবসম্পদ উন্নয়নের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে উন্নয়ন অংশীদারিত্ব অব্যাহত রাখা ও আরও সম্প্রসারণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান।

শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের বিভিন্ন দিক ও অর্জন তুলে ধরে তিনি এসব কথা বলেন।

হুমায়ুন কবির বলেন, এ সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের দীর্ঘদিনের উন্নয়ন সহযোগিতাকে পারস্পরিক লাভজনক অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্বে রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে।

বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রেখে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও বিস্তৃত করার ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, সফরের ফলাফল সরকারের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ পররাষ্ট্রনীতির প্রতিফলন। জাতীয় স্বার্থ, পারস্পরিক সম্মান এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব জোরদার করাই এ নীতির মূল লক্ষ্য।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ প্রচলিত সহজ শর্তের ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, কর্মসংস্থান এবং অভিন্ন অর্থনৈতিক সুযোগের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়।

প্রশ্নোত্তর পর্বে হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশ বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রকৃত অংশীদারিত্ব চায়। যেকোনো দেশের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিনিয়োগ ও সমান মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।

বাংলাদেশে এক লাখ কোটি ইয়েন বিনিয়োগের সম্ভাবনা

প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক লাখ কোটি ইয়েন বা প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এ বিনিয়োগের সম্ভাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন। প্রস্তাবিত বিনিয়োগ বাস্তবায়িত হলে দেশে প্রায় দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এটি জাপান সরকারের কোনো ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নয়; বরং জাপানের বেসরকারি খাত থেকে সম্ভাব্য বিনিয়োগের বিষয়।

বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নিতে শিগগিরই জাপানের একটি অর্থনৈতিক প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করতে পারে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। পারস্পরিক আলোচনা ও মন্ত্রী পর্যায়ের পরামর্শের পর উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে এ সফর হতে পারে।

হুমায়ুন কবির বলেন, বিনিয়োগের প্রস্তাবগুলো জাতীয় অগ্রাধিকার, সাশ্রয়যোগ্যতা, প্রতিযোগিতার সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা বিবেচনা করে যাচাই করা হবে। দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ ও বিনিয়োগের বিপরীতে প্রত্যাশিত সুফল নিশ্চিত করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ উদ্যোগ

প্রতিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ ও জাপান দীর্ঘদিনের ‘বে অব বেঙ্গল ইন্ডাস্ট্রিয়াল গ্রোথ বেল্ট’ (বিআইজি-বি) উদ্যোগকে ‘বিআইজি-বি ফর শেয়ার্ড প্রসপারিটি’ বা অভিন্ন সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বিআইজি-বি হিসেবে এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে।

এ উদ্যোগের আওতায় জ্বালানি, গভীর সমুদ্রবন্দর, শিল্প স্থাপনা, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং যোগাযোগব্যবস্থার সমন্বিত উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে এ বিষয়ে আলোচনা বাংলাদেশ ও জাপানের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল বলে জানান হুমায়ুন কবির। তিনি বলেন, তৃতীয় কোনো দেশকে নিয়ে এ সফরে আলোচনা হয়নি। অন্য কোনো দেশকে যুক্ত করে আঞ্চলিক উদ্যোগ নিতে হলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অংশগ্রহণ প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে বলেও জানান তিনি।

বড় উন্নয়ন প্রকল্পে জাপানের সহযোগিতা অব্যাহত

বাংলাদেশের বড় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে সহযোগিতা চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে জাপান। এ বিষয়ে আলোচনায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল চালুর প্রস্তুতি, ঢাকার গণপরিবহন বা এমআরটি প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের নির্মাণ, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় জাপানের সহযোগিতার বিষয় উঠে আসে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জাপানের ৫ হাজার কোটি ইয়েন বা প্রায় ৩১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের জরুরি সহায়তা ঋণের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) প্রেসিডেন্ট ড. আকিহিকো তানাকার সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে শেষ করার ওপর গুরুত্ব দেন। পাশাপাশি সহজ শর্তে অর্থায়ন অব্যাহত রাখা এবং কারিগরি সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

জাপানি ঋণের শর্ত নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, অর্থায়নের সাশ্রয়যোগ্যতা ও সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যায়ে থাকা অন্যান্য বিকল্পের সঙ্গে তুলনা করে ভবিষ্যৎ অর্থায়ন ব্যবস্থা মূল্যায়ন করবে।

মানবসম্পদ উন্নয়ন ও প্রযুক্তি হস্তান্তরে গুরুত্ব

প্রধানমন্ত্রীর সফরে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, কারিগরি সহযোগিতা এবং শিল্পের আধুনিকায়ন বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান হুমায়ুন কবির।

সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ইউনিক্লোর মূল প্রতিষ্ঠান ফাস্ট রিটেইলিং, মারুবেনি করপোরেশন, মিতসুবিশি করপোরেশন ও টয়োটা সুশো করপোরেশনসহ জাপানের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এসব আলোচনায় বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, উন্নত উৎপাদনশিল্প এবং অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয় গুরুত্ব পায়। পাশাপাশি প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ও রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে আলোচনা হয়।

প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে অংশ নিয়ে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশের বিনিয়োগ সম্ভাবনা কাজে লাগানোর আহ্বান জানান।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, করব্যবস্থা, শুল্ক ছাড়করণ, রেমিট্যান্স এবং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কারের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিবেশ উন্নয়নে সরকার কাজ করছে।

জ্বালানি ও উৎপাদন খাতে সহযোগিতার সম্ভাবনা

সফরের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী জাপানের ফুৎসুতে জেরা (জেইআরএ)-এর এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চিবা প্রিফেকচারের একটি লজিস্টিকস হাব পরিদর্শন করেন।

হুমায়ুন কবির জানান, এলএনজি স্থাপনা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাংলাদেশের নিজস্ব জ্বালানি অবকাঠামো পরিকল্পনার জন্য বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান অর্জন। জাপান থেকে এলএনজি আমদানির বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়নি।

এ ছাড়া ২৯ অক্টোবর নাগোয়া শহরে টয়োটার উৎপাদন কারখানা পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা বাংলাদেশে গাড়ি ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি উৎপাদনের কারখানা স্থাপনে আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।

ছয়টি সহযোগিতা দলিল সই

প্রধানমন্ত্রীর সফরকালে অর্থনৈতিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক পরিবেশ, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জলবায়ু সহযোগিতা এবং তথ্যপ্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ছয়টি সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী।

এ ছাড়া বিনিয়োগ সহায়তা এবং স্থানীয় সরকার উন্নয়নসংক্রান্ত ব্যবস্থাপনাও চূড়ান্ত করা হয়েছে।

দুই দেশ টেকসই নগরায়ণ, স্বাস্থ্যসেবা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সুরক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং ভারসাম্যপূর্ণ আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধিতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেছে।

রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান খুঁজে বের করার প্রচেষ্টায় জাপানের অব্যাহত সম্পৃক্ততাও চেয়েছে বাংলাদেশ।

এ ছাড়া দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, নৌ ও আকাশপথে চলাচলের স্বাধীনতা, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার এবং পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।