নিজস্ব প্রতিবেদক: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সহযোগী সংগঠনের সাত শীর্ষ নেতার বিরুদ্ধে করা মামলার রায় আজ মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) ঘোষণা করা হবে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করবেন।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমনে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ব্যবহার করে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার নির্দেশনা, আন্দোলনের সংবাদ সম্প্রচার বন্ধে টেলিভিশন বন্ধের নির্দেশ, তৎকালীন ডিবি কর্মকর্তা হারুন অর রশীদকে নির্দেশনা দেওয়া এবং ইন্টারনেট সেবা বন্ধে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলককে নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞে উসকানি দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে সপ্তম রায়
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালগুলোর কার্যক্রমে এটি হতে যাচ্ছে সপ্তম রায়। এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মামলাসহ চাঁনখারপুল ও আশুলিয়া হত্যাকাণ্ড, ইনুর মামলার হত্যাকাণ্ড এবং রামপুরায় কার্নিশে গুলির ঘটনায় মোট ছয়টি মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।
এ মামলার সাত আসামিই বর্তমানে পলাতক। রাষ্ট্রপক্ষ গত ১৭ আগস্ট মামলার যুক্তিতর্ক শেষ করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানায়। এরপর ট্রাইব্যুনাল মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন।
আসামিরা আদালতে উপস্থিত না থাকায় তাদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবীরা শুনানিতে অংশ নিয়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার আবেদন জানিয়েছেন।
মামলার সাত আসামি
ওবায়দুল কাদের ছাড়া মামলার অন্য আসামিরা হলেন—
- আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম;
- সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত;
- যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ;
- যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল;
- ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন;
- ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ওয়ালী আসিফ ইনান।
চারটি অভিযোগে বিচার
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে মোট চার ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগে বিচার হয়েছে।
সমন্বিত নির্দেশনা ও উসকানি: রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের আন্দোলন দমনে আসামিরা সমন্বিতভাবে নির্দেশনা দেওয়ার পাশাপাশি উসকানিমূলক ও প্ররোচনামূলক বক্তব্য দিয়েছেন।
সহিংসতার পরিকল্পনা: বিভিন্ন বৈঠকে দলীয় নেতাকর্মীদের রাজপথে নামিয়ে আন্দোলন প্রতিরোধ এবং সহিংস কর্মকাণ্ড পরিচালনার পরিকল্পনা ও নির্দেশনা দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ ও হামলা: আন্দোলনকারীদের দমনে মারণাস্ত্রের ব্যবহার, ইন্টারনেট সেবা সীমিত করার উদ্যোগ এবং নির্বিচারে বলপ্রয়োগের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের ওপর সশস্ত্র হামলার বিষয়ে অডিও প্রমাণ ও ফরেনসিক প্রতিবেদনের কথাও আদালতে তুলে ধরে।
হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ: আন্দোলন দমনের নামে দেশজুড়ে ব্যাপক সহিংসতা, হত্যা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনা ঘটেছে বলে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করেছে। তাদের মতে, এসব কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় পড়ে।
রাষ্ট্রপক্ষের বক্তব্য
রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম যুক্তিতর্কে দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন বৈঠকে মানুষ হত্যার পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। মামলায় উপস্থাপিত অডিও ও ভিডিওতে এর প্রমাণ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, আন্দোলনকারীদের দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, ওই নির্দেশনার ধারাবাহিকতায় ৫ আগস্ট পর্যন্ত নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে এবং এতে বহু মানুষ নিহত হন।
আসামিপক্ষের বক্তব্য
অন্যদিকে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম যুক্তিতর্কে আসামিদের দায় অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, জনগণের জানমাল রক্ষার উদ্দেশ্যে ‘শুট অ্যাট সাইট’ বা দেখামাত্র গুলির নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে তাঁর প্রতিনিধিত্ব করা তিন আসামি কোনো কমান্ডিং অবস্থানে ছিলেন না বলে দাবি করেন তিনি।
আইনজীবীর বক্তব্য, তাঁর মক্কেলরা কাউকে হত্যা করেননি এবং কাউকে হত্যার নির্দেশও দেননি। নির্দেশ দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্য ব্যক্তির দায় রয়েছে বলেও তিনি আদালতে যুক্তি দেন।
অন্যদিকে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের চার নেতার পক্ষে আইনজীবী ইশরাত জাহান রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ খণ্ডন করেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন দমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নেতৃত্বদানকারীদের তালিকায় তাঁর চার মক্কেল—সাদ্দাম হোসেন, ওয়ালী আসিফ ইনান, শেখ ফজলে শামস পরশ ও মাইনুল হোসেন খান নিখিল—ছিলেন না।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই সময় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন অন্যরা এবং ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অধীনস্ত নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছেন—এমন অভিযোগ থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বাস্তব সুযোগ ছিল না।
শুনানির একপর্যায়ে ট্রাইব্যুনাল জানতে চান, সংশ্লিষ্ট নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না। জবাবে আইনজীবী বলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরু থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত পরিস্থিতি ছিল অস্থির ও বিশৃঙ্খল; ফলে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ ছিল না।
এখন ট্রাইব্যুনালের রায়ের মধ্য দিয়ে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে বিচারিক সিদ্ধান্ত জানা যাবে।





