নবরাত্রির চতুর্থ দিনে দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা: মাহাত্ম্য, মন্ত্র ও পূজাবিধি

নবরাত্রির চতুর্থ দিনে দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা: মাহাত্ম্য, মন্ত্র ও পূজাবিধি
মাতা কুষ্মাণ্ড পূজা

দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা । সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয়া দুর্গোৎসব ও নবরাত্রি উদ্‌যাপনে দেবী দুর্গার বিভিন্ন রূপের আরাধনা করা হয়। নবরাত্রির চতুর্থ দিনে পূজিত হন আদিশক্তি দেবী কুষ্মাণ্ডা। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, দেবী এই রূপে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিশক্তির প্রতীক। তাঁর মৃদু হাসি থেকেই অন্ধকারাচ্ছন্ন মহাশূন্যে সৃষ্টির সূচনা হয়েছিল বলে পুরাণকথায় বর্ণনা রয়েছে।

দেবী কুষ্মাণ্ডাকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের জননী ও জগতের প্রতিপালনকারী শক্তি হিসেবে শ্রদ্ধা করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, নিষ্ঠা ও ভক্তিভরে তাঁর আরাধনা করলে জীবনের দুঃখ-কষ্ট দূর হয় এবং আয়ু, যশ, শক্তি ও সুস্বাস্থ্য লাভের আশীর্বাদ মেলে।

দেবী কুষ্মাণ্ডার রূপ ও পরিচয়

নবরাত্রির নয় দিনে দেবী দুর্গার নয়টি রূপের পূজা করা হয়, যা নবদুর্গা নামে পরিচিত। এই ধারায় চতুর্থ রূপটি দেবী কুষ্মাণ্ডা। তাঁকে আদিশক্তির প্রকাশ এবং বিশ্বসৃষ্টির উৎস হিসেবে কল্পনা করা হয়।

প্রচলিত প্রতিমা ও ধর্মীয় বর্ণনায় দেবী কুষ্মাণ্ডা অষ্টভুজা—অর্থাৎ তাঁর আটটি হাত। তাঁর বাহন সিংহ। বিভিন্ন চিত্র ও বর্ণনায় তাঁর হাতে পদ্ম, ধনুক, তির, কমণ্ডলু, চক্র, গদা, অমৃতপূর্ণ কলস ও জপমালা দেখা যায়। কিছু আঞ্চলিক রীতিতে অস্ত্র ও অন্যান্য প্রতীকের বর্ণনায় পার্থক্য রয়েছে।

দেবীর দেহকান্তি সূর্যের মতো উজ্জ্বল বলে বর্ণিত। তাই তাঁকে আলো, প্রাণশক্তি ও সৃষ্টির প্রতীক হিসেবেও দেখা হয়। ভক্তদের কাছে তিনি রোগ-শোক ও দুঃখ থেকে মুক্তির প্রার্থনায় আরাধ্য।

‘কুষ্মাণ্ডা’ নামের অর্থ ও তাৎপর্য

‘কুষ্মাণ্ডা’ নামটির ব্যাখ্যা নিয়ে বিভিন্ন ধর্মীয় ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। নবরাত্রির প্রচলিত ব্যাখ্যায় দেবীর মৃদু হাসি থেকে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছিল বলে মনে করা হয়। এই কারণে তিনি সৃষ্টির আদিশক্তি ও বিশ্বজননী হিসেবে পূজিত হন।

অন্য একটি আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যায় মানুষের জীবনের তিন ধরনের দুঃখ—আধিভৌতিক, আধিদৈবিক ও আধ্যাত্মিক তাপ—থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে দেবীর মাহাত্ম্যকে যুক্ত করা হয়। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবী কুষ্মাণ্ডার কৃপায় জীবনের প্রতিকূলতা সহ্য করার শক্তি ও মানসিক প্রশান্তি পাওয়া যায়।

স্বামী অচ্যুতানন্দের নামে প্রচলিত ব্যাখ্যায় দেবীকে জগতের দুঃখ-যন্ত্রণা নিজের মধ্যে ধারণ করে সন্তানদের রক্ষা করা করুণাময়ী জননী হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এই ভাবনায় দেবী কুষ্মাণ্ডা হলেন ত্রিতাপহারিণী—যিনি ভক্তের দুঃখ লাঘবের আশ্রয়।

দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজার মাহাত্ম্য

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, নবরাত্রির চতুর্থ দিনে সাধক নিজের মনকে অনাহত চক্রে স্থাপন করে দেবী কুষ্মাণ্ডার ধ্যান ও পূজা করেন। তাঁর আরাধনায় ভক্তরা সুস্বাস্থ্য, দীর্ঘায়ু, শক্তি, যশ ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

দেবী অল্প উপাসনাতেই সন্তুষ্ট হন—এমন বিশ্বাসও প্রচলিত। ভক্তিভরে প্রার্থনা, ধ্যান, ফুল, ফল ও নৈবেদ্য নিবেদনের মাধ্যমে তাঁর আরাধনা করা হয়। কিছু অঞ্চলে কুমড়ো নিবেদনের রীতিও রয়েছে। তবে পূজার উপাচার পরিবার, মন্দির ও আঞ্চলিক প্রথা অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।

দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজাবিধি

প্রচলিত নবরাত্রি পূজার রীতি অনুসারে দেবী কুষ্মাণ্ডার আরাধনায় কয়েকটি ধাপ অনুসরণ করা হয়—

১. ঘট ও প্রাথমিক পূজা: প্রথমে প্রতিষ্ঠিত ঘটের পূজা করে পূজার সূচনা করা হয়।

২. দেবী ও পরিবার-দেবতার আরাধনা: প্রচলিত রীতি অনুযায়ী দেবী দুর্গা এবং তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত দেবদেবীর পূজা করা হয়।

৩. দেবী কুষ্মাণ্ডার ধ্যান ও পূজা: দেবীর রূপ স্মরণ করে ফুল, ফল, ধূপ, দীপ ও নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। নিজের সামর্থ্য ও পারিবারিক রীতি অনুসারে পূজার উপাচার সাজানো যায়।

৪. মন্ত্রজপ ও প্রার্থনা: দেবীর ধ্যানমন্ত্র বা প্রচলিত স্তোত্র পাঠ করে সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়।

৫. শিবের পূজা ও সমাপনী প্রার্থনা: যে পূজাপদ্ধতিতে বিধান রয়েছে, সেখানে মহাদেবের আরাধনা করে পূজা সম্পন্ন করা হয়।

নির্দিষ্ট মন্ত্র, সংকল্প ও পূজার ক্রম অনুসরণের ক্ষেত্রে পারিবারিক পুরোহিত বা স্বীকৃত পূজাপদ্ধতির নির্দেশনা নেওয়া যেতে পারে।

কাশীর বিখ্যাত দেবী কুষ্মাণ্ডা মন্দির

উত্তরপ্রদেশের বারাণসী বা কাশীতে অবস্থিত দুর্গাকুণ্ড এলাকার বিখ্যাত দুর্গামন্দির দেবী কুষ্মাণ্ডার আরাধনার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। প্রচলিত ধর্মীয় পরিচয়ে এই মন্দিরকে দুর্গা মন্দির বলা হয়। কাশীর ধর্মীয় ঐতিহ্যে দেবীকে নগরীর দক্ষিণ দিকের রক্ষয়িত্রী হিসেবেও মান্য করা হয়।

লাল পাথরের নির্মাণশৈলী ও বহুচূড়াবিশিষ্ট স্থাপত্যের জন্য মন্দিরটি পরিচিত। নবরাত্রির সময়ে এখানে বহু ভক্তের সমাগম হয়। শারদীয়া ও বাসন্তী নবরাত্রির চতুর্থ দিনে দেবীর বিশেষ পূজা ও দর্শনকে কেন্দ্র করে তীর্থযাত্রীদের উপস্থিতি বাড়ে।

মন্দিরের বলি-প্রথা, প্রবেশসংক্রান্ত বিধিনিষেধ এবং নির্দিষ্ট আচার সম্পর্কে প্রচলিত বর্ণনার সঙ্গে বর্তমান নিয়মের পার্থক্য থাকতে পারে। তাই এসব বিষয়ে হালনাগাদ তথ্যের জন্য মন্দির কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।

ভক্তির মূল কথা

দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা কেবল আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ধর্মীয় ভাবনায় এটি সৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা, অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা এবং দুঃখের মধ্যে আশ্রয় খোঁজার প্রতীক। নবরাত্রির চতুর্থ দিনে ভক্তরা দেবীর কাছে প্রার্থনা করেন—জীবনে যেন শক্তি, সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নবরাত্রির চতুর্থ দিনে দেবী কুষ্মাণ্ডার পূজা করার রীতি মূলত নবরাত্রির দিনভিত্তিক নবদুর্গা-উপাসনার সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলা শারদীয়া দুর্গাপূজার প্রচলিত তিথি ও পূজাক্রমের সঙ্গে নবরাত্রির এই দিনভিত্তিক রীতিকে এক করে দেখা উচিত নয়। নির্দিষ্ট বছরের তিথি ও পূজার দিন স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী যাচাই করা প্রয়োজন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

নিজস্ব প্রতিবেদক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।