সামরিক সংঘাতে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ আরও বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে নৌ অবরোধ। এতে ইরানের তেল রপ্তানি, বৈদেশিক মুদ্রা আয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের দাবি।
বিশ্ব জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলা যুদ্ধ শুরুর প্রায় ছয় মাস পর তেহরানের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের অর্থনৈতিক অভিযান আরও কঠোর হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা ইরান বর্তমানে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কমছে তেল রপ্তানি, বাড়ছে অর্থনৈতিক চাপ
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের কারণে ইরানের তেল রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরকারের রাজস্ব ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহে।
হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। বিশ্বের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এই পথ দিয়ে পরিবহন করা হয়। ফলে এ পথে জাহাজ চলাচলে বড় ধরনের বাধা তৈরি হলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
আরও পড়ুনঃ ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র প্রার্থী বদলাচ্ছে এনসিপি, আসিফ-নাসীরুদ্দীনের নাম চূড়ান্ত
তবে মার্কিন ও আঞ্চলিক কর্মকর্তাদের দাবি, হরমুজকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরির যে কৌশল ইরান নিয়েছিল, তা প্রত্যাশিত মাত্রায় কার্যকর হয়নি। আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার পাশাপাশি বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থাও সক্রিয় রয়েছে।
‘ক্ষমতার ভারসাম্য ইরানের বিপক্ষে’
ইরানবিষয়ক মার্কিন বিশ্লেষক আরাশ আজিজির মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শক্তির ভারসাম্য কিছুটা ইরানের বিপক্ষে চলে গেছে।
তার ভাষ্য, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারায় এই নৌপথকে ব্যবহার করে ইরানের দর-কষাকষির সক্ষমতা কমছে। একই সঙ্গে মার্কিন নৌ অবরোধ তেহরানের ওপর উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে।
বিশ্লেষকের মতে, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল সীমিত করে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল তেহরানের। কিন্তু সেই কৌশল এখন পর্যন্ত প্রত্যাশিত ফল দেয়নি।
‘জোড়া আঘাত’ কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট বর্তমান পদক্ষেপকে নৌ অবরোধ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার সমন্বিত চাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসিকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি দাবি করেন, এই কৌশল কার্যকর হবে এবং এর মাধ্যমে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে।
আরও পড়ুনঃ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ১৬ গুরুত্বপূর্ণ মেশিন নষ্ট, ভোগান্তিতে রোগীরা
তবে তেহরান এখনো যে কোনো চাপের কাছে নতি স্বীকারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়নি। নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, বিদেশি ব্যাংকে আটকে থাকা ইরানের সম্পদ মুক্ত করা এবং হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের নিরাপত্তা কাঠামোর স্বীকৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিতে দেশটি এখনও অনড়।
অভ্যন্তরীণ অসন্তোষের আশঙ্কা
ওয়াশিংটনের অন্যতম প্রত্যাশা হলো, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে ইরানের অভ্যন্তরে জনঅসন্তোষ আরও বাড়বে। পণ্যের দাম বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
গম ও জ্বালানির মতো প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিলে জনগণের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে অতীতে দীর্ঘ সময় ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও ইরান টিকে থাকায় শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে সরকারকে নত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
সাবেক মার্কিন কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, ইরানের সামরিক বাহিনী ও কট্টরপন্থি নেতৃত্ব মনে করতে পারে যে তারা বর্তমান সংকটও মোকাবিলা করে ক্ষমতা ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক বুরচু ওজচেলিকের মতে, অর্থনৈতিক সংকট ঝুঁকি বাড়ালেও বিদেশি চাপ বা হামলার পরিস্থিতিতে ইরানি জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবাদী মনোভাব আরও শক্তিশালী হতে পারে।
হরমুজ নিয়ে সমঝোতার সম্ভাবনা
চলমান অচলাবস্থা কাটাতে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন একটি সমঝোতার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে বলে কূটনৈতিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে।
ডেনিস রসের মতে, হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজ থেকে অর্থ আদায়ের বিষয়টি আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যেতে পারে। বাধ্যতামূলক টোলের পরিবর্তে নিরাপত্তা বা পরিবেশগত সেবার বিপরীতে যৌক্তিক ফি নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে সফল হিসেবে তুলে ধরতে পারবে।
আরও পড়ুনঃ নোট ছাপাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ
তার মতে, হরমুজ প্রণালির বাণিজ্যিক নৌ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও একটি চুক্তিতে সম্মত হতে পারেন।
ফলে সামরিক সংঘাত ও অর্থনৈতিক চাপের পাশাপাশি এখন কূটনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক চলাচল স্বাভাবিক করা গেলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা কমানোর একটি পথ তৈরি হতে পারে।


