আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতার আহ্বান

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আজ: মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতার আহ্বান
আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস

আজ ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এবারের প্রতিপাদ্য— ‘মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের ৬০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এবারের প্রতিপাদ্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।

সাক্ষরতা এখন আর শুধু পড়তে ও লিখতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সুরক্ষা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনের বাস্তবতায় সাক্ষরতার ধারণা আরও বিস্তৃত হয়েছে। একজন মানুষকে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করা থেকে শুরু করে সঠিক তথ্য নির্বাচন ও প্রযুক্তির নিরাপদ ব্যবহারের সক্ষমতা তৈরি—সবই আধুনিক সাক্ষরতার অংশ।

যেভাবে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের সূচনা

শিক্ষার গুরুত্ব বিশ্বব্যাপী তুলে ধরতে ইউনেস্কো ১৯৬৬ সালে ৮ সেপ্টেম্বরকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পরের বছর, ১৯৬৭ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিবসটি আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হয়ে আসছে।

দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে সাক্ষরতার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা এবং শিক্ষা ও সাক্ষরতাকে মানব উন্নয়ন ও সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।

সাক্ষরতা একজন মানুষকে শুধু পড়াশোনার সুযোগই দেয় না; বরং তথ্য বোঝা, নিজের অধিকার সম্পর্কে জানা, কর্মসংস্থানের সুযোগ কাজে লাগানো এবং সমাজে দায়িত্বশীলভাবে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বাড়ায়।

বিশ্বে এখনও কোটি মানুষ সাক্ষরতার বাইরে

সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বিপুলসংখ্যক যুবক ও প্রাপ্তবয়স্ক এখনও মৌলিক সাক্ষরতা দক্ষতা থেকে বঞ্চিত। একই সঙ্গে বহু শিশু প্রাথমিক পর্যায়ের প্রয়োজনীয় পড়ার দক্ষতাও অর্জন করতে পারছে না।

বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশু-কিশোরের সংখ্যাও বিশ্বে এখনও উদ্বেগজনক। দারিদ্র্য, সংঘাত, সামাজিক বৈষম্য, শিক্ষার সীমিত সুযোগ এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট সংকট অনেক শিশুকে বিদ্যালয় থেকে দূরে রাখছে।

আরও পড়ুনঃ ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র প্রার্থী বদলাচ্ছে এনসিপি, আসিফ-নাসীরুদ্দীনের নাম চূড়ান্ত

বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারান আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে বৈষম্য এখনও প্রকট। এসব অঞ্চলে অর্থনৈতিক দুর্বলতা ও শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি সাক্ষরতা বৃদ্ধির পথে বড় বাধা হয়ে রয়েছে।

নারী শিক্ষায় গুরুত্ব দেওয়া জরুরি

সাক্ষরতার উন্নয়নে নারী শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনও বিপুলসংখ্যক নারী ও কিশোরী শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রয়েছে।

দারিদ্র্য, বাল্যবিবাহ, সামাজিক কুসংস্কার, নিরাপত্তাজনিত সমস্যা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা মেয়েদের শিক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে সাক্ষরতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নারী ও কন্যাশিশুর জন্য সমান শিক্ষার সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।

একজন শিক্ষিত ও দক্ষ নারী শুধু নিজের জীবনেই পরিবর্তন আনেন না; পরিবারের স্বাস্থ্য, শিশুদের শিক্ষা এবং সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

বদলে যাচ্ছে সাক্ষরতার ধারণা

ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সাক্ষরতার প্রচলিত ধারণাতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে পড়া ও লেখার পাশাপাশি ডিজিটাল সাক্ষরতা, তথ্য সাক্ষরতা, গণমাধ্যম সাক্ষরতা ও আর্থিক সাক্ষরতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে মানুষকে তথ্যের সত্যতা যাচাই করতে জানতে হচ্ছে। ভুয়া খবর, বিভ্রান্তিকর তথ্য ও অনলাইন প্রতারণা থেকে নিরাপদ থাকার জন্যও প্রয়োজন প্রয়োজনীয় ডিজিটাল জ্ঞান।

আরও পড়ুনঃ নোট ছাপাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যয় বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতনতা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই নতুন প্রজন্মকে শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব জীবনে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও তথ্য ব্যবহারের দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দিতে হবে।

বাংলাদেশের অগ্রগতি, রয়েছে চ্যালেঞ্জও

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার ছিল তুলনামূলকভাবে কম। এরপর প্রাথমিক শিক্ষার সম্প্রসারণ, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কার্যক্রম, সরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের মাধ্যমে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।

তবে দেশের সব অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ সমান নয়। শহর ও গ্রামের মধ্যে পার্থক্যের পাশাপাশি চর, হাওর, পাহাড়ি এলাকা ও অন্যান্য দুর্গম অঞ্চলের মানুষের জন্য শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও পড়ুনঃ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের ১৬ গুরুত্বপূর্ণ মেশিন নষ্ট, ভোগান্তিতে রোগীরা

প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, দরিদ্র পরিবার এবং বিদ্যালয়ের বাইরে থাকা শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতে আরও কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।

প্রযুক্তি হতে পারে নতুন সম্ভাবনার দরজা

ডিজিটাল শিক্ষা ও প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগ সাক্ষরতা বিস্তারে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। মোবাইলভিত্তিক শিক্ষা, অনলাইন কনটেন্ট, ডিজিটাল লাইব্রেরি এবং দূরশিক্ষণ ব্যবস্থা প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছেও শিক্ষার সুযোগ পৌঁছে দিতে পারে।

তবে ডিজিটাল সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করা জরুরি। ইন্টারনেট, স্মার্ট ডিভাইস ও প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ যদি কেবল শহর ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে নতুন ধরনের শিক্ষাবৈষম্য তৈরি হতে পারে।

সাক্ষরতা শুধু একটি দিবসের বিষয় নয়

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা ও সাক্ষরতা কোনো নির্দিষ্ট বয়স বা শ্রেণির মানুষের জন্য সীমাবদ্ধ বিষয় নয়। পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে প্রত্যেক মানুষের জন্য জীবনব্যাপী শেখার সুযোগ প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বিভাজন এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময়ে সচেতন ও দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সাক্ষরতার বিকল্প নেই।

সাক্ষর মানুষ নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন, অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে পারেন এবং সমাজের উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেন। তাই সাক্ষরতায় বিনিয়োগকে শুধু শিক্ষা খাতের ব্যয় হিসেবে নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ গঠনের দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে।

আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবসের মূল প্রত্যাশা হোক—কোনো মানুষ যেন জ্ঞান ও শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না থাকে। মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য একটি টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা ও বহুমাত্রিক সাক্ষরতা নিশ্চিত করাই হতে পারে আমাদের অঙ্গীকার।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।