বাংলাদেশকে ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করতে শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারকারী নয়, বরং প্রযুক্তির উদ্ভাবক ও রপ্তানিকারক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিটের প্রধান মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ।
তিনি রপ্তানি বহুমুখীকরণ, তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং দেশীয় উদ্যোক্তাদের আন্তর্জাতিক বাজারে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অ্যাম্বাসেডর ফেরদৌস শাহরিয়ার অডিটোরিয়ামে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গভর্নেন্স ইনোভেশন ইউনিট ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘এআই অ্যান্ড ইনোভেশন’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, তৈরি পোশাক ও রেমিট্যান্সের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি ও সেবা খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে। এর প্রায় ৯০ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। একই সময়ে প্রবাসী বাংলাদেশিরা প্রায় ৩০ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এ দুটি খাত অর্থনীতির বড় শক্তি হলেও সীমিত কয়েকটি উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্যস্ফীতি, ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন কিংবা বিভিন্ন ধরনের সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস এখনই বহুমুখী করা প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, এআইকে শুধু সরকারি কাজ দ্রুত করার প্রযুক্তি হিসেবে দেখলে হবে না। এআই, সফটওয়্যার, আউটসোর্সিং ও প্রযুক্তিনির্ভর সেবা বাংলাদেশের জন্য বিলিয়ন ডলার আয়ের সম্ভাবনাময় খাত হতে পারে।
তিনি বলেন, ছোট দেশ হয়েও ইসরাইল হাজার হাজার প্রযুক্তি কোম্পানি এবং শক্তিশালী প্রযুক্তি শিল্প গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশের বিপুল তরুণ ও মেধাবী জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে একইভাবে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশের উচ্চপর্যায়ের একটি প্রতিনিধি দলের সিলিকন ভ্যালি সফরের প্রসঙ্গ তুলে ধরে ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, অ্যাপল, মেটা ও এনভিডিয়ার মতো বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেছে। অ্যানথ্রপিকও বাংলাদেশে কাজ করার বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে বলে জানান তিনি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ উইংকে আরও কার্যকর করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক উইংগুলোকে শুধু আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এসব উইংকে নতুন উদ্যোক্তা, বিনিয়োগকারী, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করতে হবে।
জনপ্রশাসন উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের লক্ষ্য শুধু প্রযুক্তির ভোক্তা হওয়া নয়; প্রযুক্তির স্রষ্টা, মালিক ও রপ্তানিকারক হওয়া।
দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে সরকারি সেবা, ডিজিটাল পরিচয়, কৃষি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার জন্য কার্যকর এআইভিত্তিক সমাধান তৈরিতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান তিনি। তার মতে, দেশে তৈরি এসব প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক বাজারেও রপ্তানি করা সম্ভব।
একই সঙ্গে দেশের বড় বাজারকে কাজে লাগিয়ে হার্ডওয়্যার উৎপাদনের সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেন ইসমাইল জবিউল্লাহ। কম্পিউটার, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিপণ্যে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি বলেন, এআই নিয়ে আলোচনা শুধু সেমিনার বা সংলাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী সমাজ ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ে দ্রুত বাস্তবমুখী ও সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, প্রতিমন্ত্রী-২ শামা ওবায়েদ ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, বিভিন্ন দেশের দূতাবাসের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং আইসিটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, ব্যবসায়ী নেতা ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।





