ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনের ইতিহাসে বাংলার অন্যতম প্রধান বিপ্লবী সংগঠন যুগান্তর দলের সাহসী নেতা যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়, যিনি ‘বাঘা যতীন’ নামে পরিচিত, তাঁর আত্মদান দিবস আজ।
১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে গুরুতর আহত অবস্থায় বালেশ্বর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিপ্লবী। মৃত্যুর আগে তাঁর উচ্চারণ—‘আমরা মরব, দেশ জাগবে’—পরবর্তী প্রজন্মের কাছে আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমের এক অনন্য প্রতীক হয়ে আছে।
বিপ্লবী জীবনের সূচনা
যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ১৮৭৯ সালের ৭ ডিসেম্বর তৎকালীন কুষ্টিয়া জেলার কয়া গ্রামে মাতামহের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা উমেশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় এবং মা শরৎশশী দেবী। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারানোর পর মা ও বড় বোন বিনোদবালার সঙ্গে তিনি কয়া গ্রামে চলে যান।
শৈশব থেকেই শারীরিক সক্ষমতা, সাহস ও নেতৃত্বগুণের জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা, শরীরচর্চা, নাট্যচর্চা এবং সমাজসেবায়ও তাঁর আগ্রহ ছিল।
তাঁর ‘বাঘা যতীন’ নামকরণের সঙ্গে একটি বহুল প্রচলিত কাহিনি জড়িয়ে আছে। কথিত আছে, একবার একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের সঙ্গে তাঁর ভয়াবহ লড়াই হয়। হাতে থাকা ছোট ছুরি দিয়ে বাঘটির মোকাবিলা করে তিনি সেটিকে পরাস্ত করেন। সেই ঘটনার পর থেকেই তাঁর নামের সঙ্গে ‘বাঘা’ উপাধিটি স্থায়ী হয়ে যায়। তবে এই নামটি ঠিক কে দিয়েছিলেন, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না।
বিবেকানন্দের প্রভাব
কৈশোর ও যৌবনে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তাধারা যতীন্দ্রনাথকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। কলকাতায় অবস্থানকালে তিনি শরীরচর্চার পাশাপাশি দেশসেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। প্লেগ মহামারির সময়ও তিনি আক্রান্ত মানুষের সেবায় এগিয়ে এসেছিলেন।
বিবেকানন্দের পরামর্শে তিনি শরীরচর্চা ও কুস্তির আখড়ায় যোগ দেন। একই সময়ে ইতালির বিপ্লবী নেতা জিউসেপ্পে মাজ্জিনি ও গারিবাল্ডির জীবন এবং জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের ইতিহাসও তাঁকে প্রভাবিত করে।
পেশাগত জীবনে তিনি স্টেনোগ্রাফার হিসেবে কাজ করলেও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর রাজনৈতিক ও বিপ্লবী কর্মকাণ্ড ক্রমেই বিস্তৃত হতে থাকে।
যুগান্তর ও সশস্ত্র বিপ্লব
ভারতের স্বাধীনতার লক্ষ্যে গোপন বিপ্লবী সংগঠন গড়ে তোলার কাজে যতীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর নেতৃত্বে বিপ্লবীদের একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। ব্রিটিশবিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনাও তাঁর বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় জার্মানির কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা পাওয়ার পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়ে আছে। ইতিহাসে এটি ‘জার্মান প্লট’ নামে পরিচিত। উদ্দেশ্য ছিল ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বৃহত্তর সশস্ত্র অভ্যুত্থান সংগঠিত করা।
যতীন্দ্রনাথ ব্যক্তিগত জীবন ও পারিবারিক স্বার্থের চেয়ে দেশের স্বাধীনতাকে বেশি গুরুত্ব দিতেন। ১৯০০ সালে ইন্দুবালা দেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সন্তানও ছিল। কিন্তু বিপ্লবী কর্মকাণ্ড থেকে তিনি কখনো সরে আসেননি।
বুড়িবালামের তীরে শেষ লড়াই
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ গোয়েন্দা ও পুলিশ বাহিনী যতীন্দ্রনাথ এবং তাঁর সহযোগীদের গতিবিধি অনুসরণ করতে থাকে। পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বে ব্যাপক অভিযান শুরু হয়।
১৯১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যতীন্দ্রনাথ তাঁর কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে উড়িষ্যার বালেশ্বর অঞ্চলে অবস্থান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ বাহিনী তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করে।
৯ সেপ্টেম্বর বুড়িবালাম নদীর তীরে শুরু হয় তুমুল বন্দুকযুদ্ধ। বিপ্লবীদের সঙ্গে ব্রিটিশ পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর এই সংঘর্ষ ইতিহাসে ‘বুড়িবালামের যুদ্ধ’ নামে স্মরণীয় হয়ে আছে।
যুদ্ধে চিত্তপ্রিয় রায়চৌধুরী শহীদ হন। যতীন্দ্রনাথসহ অন্য কয়েকজন বিপ্লবী গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে তাঁদের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে ব্রিটিশ বাহিনী তাঁদের আটক করতে সক্ষম হয়।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস: সচেতনতা ও সহমর্মিতাই পারে বাঁচাতে জীবন
আহত অবস্থায় যতীন্দ্রনাথকে বালেশ্বর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানেই ১৯১৫ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ৩৬ বছর।
আত্মত্যাগের অমর প্রতীক
বাঘা যতীনের বিপ্লবী জীবন ছিল সাহস, আত্মত্যাগ ও দেশপ্রেমে পরিপূর্ণ। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের ইতিহাসে তাঁর নেতৃত্ব ও বুড়িবালামের তীরের শেষ লড়াই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তাঁর মৃত্যুর পর ব্রিটিশ পুলিশ কর্মকর্তা চার্লস টেগার্টও তাঁর সাহস ও ব্যক্তিত্বের প্রশংসা করেছিলেন বলে ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। একজন ঔপনিবেশিক কর্মকর্তার কাছ থেকেও এমন স্বীকৃতি বাঘা যতীনের অসাধারণ ব্যক্তিত্বের একটি উল্লেখযোগ্য দিক তুলে ধরে।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামও বুড়িবালামের সেই রক্তক্ষয়ী লড়াইকে কবিতায় স্মরণ করেছেন। তাঁর কবিতায় বাঘা যতীন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের বীরত্ব বাংলার বিপ্লবী ইতিহাসের প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছে।
ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মত্যাগ ও সাহসী প্রতিরোধের ইতিহাসে বাঘা যতীন আজও এক উজ্জ্বল নাম। তাঁর জীবন ও আত্মদান ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে।




