আজ ১ আগস্ট থেকে শুরু হয়েছে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ (World Breastfeeding Week)। কমছে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান, উদ্বেগে বিশেষজ্ঞরা প্রতি বছর ১ থেকে ৭ আগস্ট বিশ্বের ১৭০টিরও বেশি দেশে এ সপ্তাহ পালিত হয়। নবজাতকের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা, মাতৃদুগ্ধের উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মায়েদের বুকের দুধ খাওয়াতে উৎসাহিত করাই এ আয়োজনের মূল লক্ষ্য।
বাংলাদেশে ২০১০ সাল থেকে নিয়মিতভাবে বিশ্ব মাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য ‘টেকসই জীবনের সুদৃঢ় সূচনা: সফল উদ্যোগগুলো শক্তিশালী করি’। এ উপলক্ষে বাংলাদেশ ব্রেস্ট ফিডিং ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শিশুর জন্য মায়ের দুধই একমাত্র পূর্ণাঙ্গ ও আদর্শ খাদ্য। এতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের পুষ্টি উপাদান, রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও মস্তিষ্কের বিকাশে সহায়ক উপাদান থাকে।
গবেষণায় দেখা গেছে, একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পান করানো হলে শিশুর ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া, কান ও শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, অ্যালার্জি, একজিমা, অতিরিক্ত ওজন এবং ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে। পাশাপাশি মায়ের ক্ষেত্রেও স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস পায়।
ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সায়েন্সের গবেষণা অনুযায়ী, মাতৃদুগ্ধ শিশুমৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে সহায়ক।
ইউনিসেফের সহযোগিতায় বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) পরিচালিত মাল্টিক্লাস্টার ইন্ডিকেটর সার্ভে (MICS) ২০২৫ অনুযায়ী, দেশে জন্মের এক ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩০ শতাংশ নবজাতক মায়ের বুকের দুধ পায়।
এ ছাড়া, শূন্য থেকে পাঁচ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধুমাত্র মাতৃদুগ্ধ পানের হার বর্তমানে ৫৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ হার ছিল প্রায় ৬৩ শতাংশ। অর্থাৎ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার নিম্নমুখী হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল করে দিচ্ছে এবং সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
আরও পড়ুনঃ আজ বিশ্ব স্কাউট স্কার্ফ ডে: স্কাউটদের ঐক্য, নেতৃত্ব ও সেবার প্রতীক উদযাপন
চলতি বছরে দেশে হামের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পাওয়ায় শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদান সবচেয়ে কার্যকর হলেও শিশুর প্রাথমিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গড়ে তুলতে মাতৃদুগ্ধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের দুধ শিশুর শরীরে প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বিশেষ করে শালদুধে থাকা অ্যান্টিবডি বিভিন্ন ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
আইইডিসিআরের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. মাহমুদুর রহমান বলেন, হাম প্রতিরোধে টিকা অপরিহার্য হলেও শিশুর সার্বিক রোগ প্রতিরোধক্ষমতা গঠনে মাতৃদুগ্ধের বিকল্প নেই। তবে মাতৃদুগ্ধের পাশাপাশি টিকাদান, পুষ্টি এবং স্বাস্থ্যসেবাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একচেটিয়া মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
যদিও দেশে ‘মাতৃদুগ্ধ বিকল্প শিশুখাদ্য, শিশুখাদ্য ও এর সরঞ্জামাদি (বিপণন নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩’ রয়েছে, তবে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ—এর বাস্তব প্রয়োগ এখনও যথেষ্ট কার্যকর নয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধুমাত্র প্রচারণা নয়, মাতৃদুগ্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ। এর মধ্যে কর্মস্থলে মাতৃদুগ্ধবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, মাতৃত্বকালীন সহায়তা বৃদ্ধি, ফর্মুলা দুধের অনিয়ন্ত্রিত প্রচারণা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন অন্যতম।
তাদের মতে, একটি শিশুর জীবনের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো মায়ের বুকের দুধ। সেই অধিকার নিশ্চিত করা গেলে শিশুস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, অপুষ্টি হ্রাস এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সুস্থ ও সক্ষম করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।