শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতির বাণী

রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ ২১ ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ২০২০ উপলক্ষে নিম্নোক্ত বাণী প্রদান করেছেন :

“মহান ‘শহিদ দিবস’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ ২০২০ উপলক্ষে আমি বাংলাসহ বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগণ ও জাতিগোষ্ঠীকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি সংরক্ষণে এ দিবসটি উদ্যাপন এক অনন্য উদ্যোগ।

মহান ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় ঘটনা। আমি গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করি মাতৃভাষা বাংলার অধিকার আদায়ে জীবন উৎসর্গকারী ভাষা শহিদ রফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, শফিউরসহ নাম না জানা শহিদদের। আমি সশ্রদ্ধচিত্তে স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যিনি ১৯৪৮ সালে মাতৃভাষার দাবিতে গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন। স্মরণ করি তৎকালীন গণপরিষদ সদস্য, ধীরেন্দ্রনাথ দত্তকে যিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলে ধরেন। আমি স্মরণ করি সকল ভাষা সংগ্রামীকে, যাঁদের দূরদৃষ্টি, অসীম ত্যাগ, সাহসিকতা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। বাঙালি পায় মাতৃভাষার অধিকার।

ভাষা আন্দোলন ছিল আমাদের মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি নিজস্ব জাতিসত্তা, স্বকীয়তা ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষারও আন্দোলন। অমর একুশের অবিনাশী চেতনা-ই আমাদের যুগিয়েছে স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস। ফেব্রুয়ারির রক্তঝরা পথ বেয়েই অর্জিত হয় মাতৃভাষা বাংলার স্বীকৃতি এবং এরই ধারাবাহিকতায় আসে বাঙালির চিরকাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা, যার নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

ভাষা ও সংস্কৃতি মানবজাতির অমূল্য সম্পদ। এটি মহাকালকে যেমন ধারণ করে, তেমনি মানব ইতিহাসের বৈচিত্র্যময় জীবনধারাকে প্রবাহমান রাখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। দারিদ্র্য, সাম্রাজ্যবাদ, বাণিজ্যবাদ, ধর্মপ্রচার, অভিবাসন, উদ্দেশ্যমূলক আর্থিক ও মানবিক সহযোগিতা, ভাষার উপযুক্ত চর্চার অভাব, জনসংখ্যা হ্রাস, পরিবেশের অবক্ষয়, আকাশ সংস্কৃতিসহ নানা কারণে পৃথিবীতে প্রতিনিয়ত কোনো না কোনো ভাষার বিলুপ্তি ঘটছে। ভাষার বিলুপ্তি মানে এক একটা সংস্কৃতির বিলোপ, জাতিসত্তার বিলোপ, সভ্যতার অপমৃত্যু। মাতৃভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশসহ সকল জাতিগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় বিশ্ববাসীকে সোচ্চার হতে হবে।

মাতৃভাষার জন্য জীবন উৎসর্গ বিশ্বে বিরল ঘটনা। ১৯৯৯ সালে কয়েকজন মাতৃভাষাপ্রেমী প্রবাসী বাঙালির প্রাথমিক উদ্যোগ এবং সর্বোপরি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও ঐকান্তিক চেষ্টায় জাতিসংঘ কর্তৃক ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এ ছিল বাঙালি হিসেবে আমাদের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বিশ্বের বিকাশমান ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় গবেষণার জন্য ২০০১ সালে ঢাকায় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাছাড়া দেশে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণ ও উন্নয়নে তাদের নিজস্ব ভাষায় পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

নিজস্ব মাতৃভাষার উন্নয়ন ও সংরক্ষণের পাশাপাশি বহুভাষিক শিক্ষার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ করতে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উদ্যাপন ইতিবাচক অবদান রাখবে বলে আমার বিশ্বাস। বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উৎস। এ চেতনাকে ধারণ করে পৃথিবীর নানা ভাষাভাষী মানুষের সাথে নিবিড় যোগসূত্র স্থাপিত হোক, লুপ্তপ্রায় ভাষাগুলো আপন মহিমায় নিজ নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে উজ্জীবিত হোক, গড়ে উঠুক নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য বিশ্ব-মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এ কামনা করি।
খোদা হাফেজ, বাংলাদেশ চিরজীবী হোক

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Ovi Pandey
লেখক / প্রতিবেদক

Ovi Pandey

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।