যশোর ও ঝিনাইদহে কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বিপাকে ড. রওশন আলী

যশোর ও ঝিনাইদহে কলেজ প্রতিষ্ঠা করে বিপাকে ড. রওশন আলী

যশোর থেকে ই.আর.ইমন
যশোর সদর উপজেলার নাটুয়াপাড়া ও ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মাজদিয়া গ্রামের সীমান্ত মৌজায় প্রতিষ্ঠিত ড. রওশন আলী কলেজ অব সাইন্স টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট। দুই দশক ধরে দুই উপজেলার মানুষের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

যার উদ্যোগ ও নামে এ কলেজটি প্রতিষ্ঠিত সেই প্রতিষ্ঠাতার নামেই দায়ের করা হয়েছে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মিথ্যা মামলা। বিষয়টিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও ষড়যন্ত্রমূল হিসেবেই দেখছেন এলাকাবাসী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতার অসৎ উদ্দেশ্যে সাধনের লক্ষে প্রতিষ্ঠাতা ড. রওশন আলীকে মাইনাস করতে ষড়যন্ত্র ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে।

সাবেক সভাপতি ও যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন ও বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান মিন্টুর রোষানলে পড়েছেন প্রফেসর ড. রওশন আলী। তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করায় ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীও।
এদিকে, অ্যাডহক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ৮ ডিসেম্বর। কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি গঠনের কোন প্রক্রিয়া করেননি অধ্যক্ষ শাহ জালাল। অধ্যক্ষ শাহ জালালের বিরুদ্ধে কলেজ ধ্বংস ও শিক্ষার পরিবেশ নিনষ্টের অভিযোগ এলাকাবাসীর।

জানা যায়, চলতি বছরের ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মোহাম্মদ আলমগীর হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে বলা হয়েছে, ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতামত অনুযায়ী ড. রওশন আলী কলেজ অব সাইন্স টেকনোলজি অ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্ট কলেজটি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মাজদিয়া মৌজায় প্রতিষ্ঠিত। অথচ গত এপ্রিল মাসে কলেজটির অ্যাডহক কমিটির সভাপতি করা হয়েছে যশোর সদরের বাসিন্দা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান মিন্টুকে। অভিযোগ রয়েছে, মেহেদী হাসান মিন্টু তার আধিপত্য ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠাতাকে মাইনাসের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন। তিনি গত ২৮ অক্টোবর যশোর আদালতে ড. রওশন আলীর নামে অর্থ আত্মসাতের মামলা দায়ের করেছেন। পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মামলার অভিযোগে মেহেদী হাসান মিন্টু বলেছেন, ড. রওশন আলী কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক সভাপতি। ২০০১ সালে কলেজটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর কলেজের নামকরণের জন্য নিয়মানুযায়ী ন্যাশনাল ব্যাংক মহাখালী শাখায় তৎকালীন পরিচালনা পরিষদ একটি সঞ্চয়ী হিসাব নম্বর খোলা হয়। ওই বছরের ১৭ জানুয়ারি হিসাব নম্বরে ১৫ লাখ টাকা জমা রাখা হয়। রেজুলেশন ও তৎকালীন পরিচালনা পরিষদের অনুমতি ছাড়া বিভিন্ন সময়ে ড. রওশন আলী ৮টি চেকের মাধ্যমে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৪৭৫ টাকা উত্তোলন করেন। ২০১৮ সালের ২১ সেপ্টেম্বর ওই কলেজের তৎকালীন সভাপতি যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহীদুল ইসলাম মিলন আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ড. রওশন আলীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছিলেন।

২০২০ সালের ১৮ মার্চ সভাপতি শহীদুল ইসলাম মিলনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পরিষদের এক সভায় আত্মসাতকৃত টাকা ফেরত না দেয়ায় ডা. রওশন আলীর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সিদ্ধান্ত হয়। এরই মধ্যে কলেজের বর্তমান সভাপতির মেয়াদ শেষ হয়। অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হন যশোর সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান মিন্টু। তিনিও গত ১৭ অক্টোবর ড. রওশন আলীর কাছে টাকা ফেরত চাইলে দিতে পারবে না বলে জানিয়ে দেন। টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে সভাপতি এ মামলা করেন।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) যশোরের পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন বলেন, মামলার নথি পেয়েছি। প্রতিষ্ঠাতা রওশন আলী কলেজ ফান্ডের টাকা খরচ করেছেন। তার সেই টাকা খরচ যথাযথ প্রক্রিয়া হয়েছে কিনা সেটি খতিয়ে দেখবে পিবিআই।
যোগাযোগ করা হলে মেহেদী হাসান মিন্টু বলেন, আমি মামলা করেছি। মামলায় সব উল্লেখ করেছি।
তিনি বলেন, কলেজের টাকা তিনি এককভাবে উত্তোলন করেছেন। উনি নিজের ইচ্ছামত খরচ করেছেন। কলেজের কেউ এ বিষয়ে কিছুই জানে না। এছাড়া এক টাকা একাধিক বার দেখিয়েছেন।

জানতে চাইলে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কলেজ পরিচালনা পরিষদের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলন বলেন, কলেজের নাম করণের জন্য ১৫ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। এছাড়া প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হতে হলে আরো ১০ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। কিস্তু ড. রওশন আলী এ টাকা জমা দেননি।

তিনি বলেন, কলেজ প্রতিষ্ঠাতার নাম করণের জন্য টাকা স্থানীয় ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। যৌথ নামে একাউন্ট করতে হয়। কিন্তু তিনি তা না করে এবং স্থানীয় ব্যাংকে টাকা না রেখে ঢাকার একটি ব্যাংকে জমা রাখেন। জমাকৃত টাকা খরচ করতে হলে মন্ত্রণালয়ের অনুমতি নিতে হয়। কিন্তু তিনি তা নেননি।কলেজের বিল্ডিং আসবাবপত্র ও জমি কেনার টাকা কোন জায়গা থেকে এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমাদের দেখার বিষয় না। কলেজের বিল্ডিং আসবাবপত্র ও জমি কেনার টাকা কোন জায়গা থেকে এসেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি আমাদের দেখার বিষয় না।

মামলা ও অভিযোগের বিষয়ে প্রফেসর ড. রওশন আলী বলেন, আমি আমার জমি ও টাকা দিয়ে নিজের নামে ড. রওশন আলী কলেজ অব সায়েন্স, টেকনোলজি এ্যান্ড বিজনেস ম্যানেজমেন্টে কলেজের শুরু করি। যশোর ও ঝিনাইদহ জেলার সীমান্ত রেখা বরাবর স্থাপিত কলেজটির সাড়ে ৯ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিষ্ঠাকালীন সময় কলেজটির ঠিকানা ঝিনাইদহের ছিল। কিন্তু এর পোস্ট অফিস ছিল যশোর সদরের নাটুয়াপাড়ায়। এরফলে ডাক যোগাযোগের ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হতো। এ কারণে যশোর শিক্ষাবোর্ডের নিদের্শনা মেনে যশোর সদরের অংশে করা হয়। কিন্তু এখন সেই নাটুয়াপাড়া পোস্ট অফিসটিই উঠে গেছে। এখন কলেজের পোস্ট অফিস ঝিনাইদহ জেলার হাট বারোবাজার। ফলে সেই সমস্যা আবার ফিরে এসেছে। এ সমস্যা দূর করতে এবং যেহেতু কলেজটি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার মাঝদিয়া মৌজায় অবস্থিত তাই আমি পূর্বের ঠিকানা বহাল করার জন্য আবেদন করেছি।

তিনি বলেন, যশোর সদর আসনের সংসদের অনুসারী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শহিদুল ইসলাম মিলনকে কলেজের সভাপতি মনোনীত করেছিলেন। পরবর্তিতে সদর উপজেলা আওয়ামীলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান মিন্টুকে এডহক কমিটির সভাপতি মনোনীত করে কমিটি গঠন করেন। মিন্টুর কমিটির মেয়াদও শেষ হয়েছে।
তিনি অভিযোগ করেন, আমার নিজস্ব অর্থায়নে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে অবৈধ্যভাবে নিয়োগ বাণিজ্য করছেন। উল্টো আমার নামেই মিথ্যা অর্থ আত্মসাতের মামলা দিয়ে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য হাসিল করছে।

বারবাজার ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ড. রওশন আলী একজন ভালো মানুষ। তিনি এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষত করার মন নিয়ে কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। নিজের জমি ও টাকা দিয়ে কলেজ করে তাকেই আজ চোর বদ নাম দেওয়া হচ্ছে। যারা এই ষড়যন্ত্রের সাথে আমরা তাদের বিচার ও দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।

যশোর সদরের হৈবৎপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগ নেতা ও সাবেক ম্যানেজিক কমিটির সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, কলেজটি ধ্বংস করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে যশোরের আওয়ামী লীগের কতিপয় নেতা। তারা এলাকার ছেলেমেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করতে এই হীন মানুষিকতা নিয়ে একজন ভালো মানুষের নামে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র মূলক মামলা দায়ের করেছেন। যারা এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত তাদের শাস্তির দাবি করছি।

অধ্যক্ষের শাহ জালাল বলেন, আমি অসুস্থ। আমি কথা বলতে পারছি না। কলেজ পরিচালনা কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে কেন নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া করেননি জানতে চাইলে বলেন, অসুস্থ্য ছিলাম, এ কারণে হয়নি। এ মাসে করা হবে বলে ফোন কেটে দেন।
কলেজ পরিচালানা পরিষদ গঠনের বিষয়ে জানতে চাইলে যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মোল্যা আমির হোসেন বলেন, শিক্ষা বোর্ড চাইলে যাকে খুশি তাকে সভাপতি বানানো যেতে পারে। তবে নির্বাচন হলে মানুষ যাকে ভোট দেবে তিনিই সভাপতি হবেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।