পরের স্ত্রীর সাথে অনৈতিক সম্পর্কের দায় কি শুধু পুরুষের?

প্রতিবেশী ডেস্কঃ অন্যের স্ত্রীর সঙ্গে ব্যভিচারের দায় শুধুমাত্র বিবাহিত পুরুষেরই। মহিলার স্বামীর অজান্তে কোনও পুরুষ ও বিবাহিত মহিলার মধ্যে এমন সম্পর্ক তৈরি হলে তার শাস্তি পুরুষেরই প্রাপ্য। এমনকী, বিবাহিত ওই মহিলার সম্মতিতেই যদি বিবাহিত পুরুষটির সঙ্গে তাঁর শারীরিক সম্পর্ক হয়ে থাকে, আইনের চোখে অপরাধী একমাত্র ব্যভিচারী পুরুষই। ১৫৭ বছরের পুরনো সংবিধানের এই সংস্থান নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিল সুপ্রিম কোর্ট। এমন আইন আসলে লিঙ্গ বৈষম্যকে প্রকট করে বলেই মত সংশ্লিষ্ট মহলের।

একটি সর্বভারতীয় ইংরেজি দৈনিকে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ব্যভিচারের শাস্তি শুধুমাত্র পুরুষরাই কেন পাবেন, একটি জনস্বার্থ মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সেই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা খতিয়ে দেখার বিষয়ে সম্মতি জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ।

প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্র, বিচারপতি এ কে খানউইলকর ও বিচারপতি ডি ওয়াই চন্দ্রচূড়কে নিয়ে গড়া ডিভিশন বেঞ্চ বিষয়টি নিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে কেন্দ্রের কাছ থেকে হলফনামা চেয়েছে। জোসেফ শাইন নামে কেরলের এক বাসিন্দা আদালতে জনস্বার্থ মামলা দায়ের করে প্রশ্ন তোলেন, উভয়ের সম্মতিতে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হলে ব্যভিচারের শাস্তি একা পুরুষটি কেন ভোগ করবেন?

ভারতীয় আইন অনুযায়ী, যে কোনও ব্যভিচারী সম্পর্কের ক্ষেত্রেই মহিলাকে নির্দোষ বলে গণ্য করা হয়। তা সে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে তাঁর যে ভূমিকাই থাক না কেন।

আইনজীবী কালিস্বরম রাজ অবশ্য আদালতে সওয়াল করে বলেন, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী, অবিবাহিত কোনও পুরুষ এবং মহিলা অথবা একজন অবিবাহিত পুরুষের সঙ্গে বিবাহিত মহিলা কিংবা একজন বিবাহিত পুরুষের সঙ্গে একজন অবিবাহিত মহিলার মধ্যে যদি পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে শারীরিক সম্পর্ক হয়, তাহল‌ে তা ব্যভিচার বলে গণ্য হয় না।

যদিও, ৪৯৭ ধারাতেই বলা আছে, ‘‘কোনও পুরুষ যদি জেনেশুনে কোনও বিবাহিত মহিলার সঙ্গে তাঁর স্বামীর সম্মতি না নিয়ে বা তাঁর অজান্তে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন, এমন শারীরিক সম্পর্ক ধর্ষণ হিসেবে গণ্য করা না গেলেও তা ব্যভিচারের সমান অপরাধ হিসেবেই গণ্য হবে এবং শাস্তিস্বরূপ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা জরিমানা কিংবা উভয়ই প্রযোজ্য হতে পারে। যদিও, এক্ষেত্রে এমন সম্পর্ক যুক্ত বিবাহিত মহিলাকে অপরাধে যুক্ত থাকার জন্য কোনও শাস্তি দেওয়া যাবে না।’’

মামলার শুনানি চলাকালীন ডিভিশন বেঞ্চ মন্তব্য করে, ‘‘প্রাথমিকভাবে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা খতিয়ে দেখে আমদের মনে হচ্ছে এই ধারাটি বিবাহিত মহিলাকে নির্যাতিত বলে মনে করে। এটাও মাথায় রাখতে হবে যে যখন একটি অপরাধে দু’জন যুক্ত, তখন একজনকে অপরাধী হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে আর দ্বিতীয়জনকে নিরপরাধ বলে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। এর থেকেই মনে হয় যে এমন আইনি সংস্থান মূলত সামাজিক ধারণার ভিত্তিতেই তৈরি হয়েছে।’’

ডিভিশন বেঞ্চ আরও বলে, সাধারণত ফৌজদারি আইন লিঙ্গ ভেদাভেদ করে না। কিন্তু সংবিধানের এই সংস্থানে লিঙ্গ নির্বিশেষে শাস্তি দেওয়ার এই ধারণাটাই অনুপস্থিত। শুধু তাই নয়, বর্তমান আইনে মহিলাদেরকেই যাবতীয় ইতিবাচক অধিকার দেওয়া হয়েছে। মহিলাকে যেভাবে নির্যাতিত প্রতিপণ্য করে পুরুষকে শাস্তি দেওয়ার সংস্থান রয়েছে, তা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছে শীর্ষ আদালত।

৪৯৭ ধারার আরও একটি ব্যাখ্যা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে আদালত। এই ধারা অনুযায়ী, কোনও বিবাহিত মহিলার স্বামীর সম্মতি নিয়ে ওই মহিলার সঙ্গে কোনও পুরুষ শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হলে তা ব্যভিচার বলে গণ্য হবে না। ডিভিশন বেঞ্চের প্রশ্ন, এমন আইনি সংস্থান কোনও মহিলার ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং পরিচয়ের পরিপন্থী। অথচ সংবিধান পুরুষ-মহিলাকে সমানাধিকার দিয়েছে।সূত্র:- এবেলা

কেন্দ্রের হলফনামা চেয়ে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ বলে, ‘‘সমাজকে বুঝতে হবে যে প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুরুষ এবং মহিলা এখন সমান। কিন্তু আইনের এই ধারাটি বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে কিছুটা হলেও যেন সেকেলে। সমাজ যখন এগিয়ে চলেছে, সবাই নিজের প্রাপ্য অধিকার পাচ্ছে, নতুন ধরনের চিন্তাধারা তৈরি হচ্ছে, তখন এই বিষয়টি নিয়ে ভেবে দেখতে আমরা বাধ্য হলাম।’’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।