ইসকন প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের জন্মদিন আজ, জীবনী ও কর্মযজ্ঞ

ইসকন প্রতিষ্ঠাতা ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের জন্মদিন আজ, জীবনী ও কর্মযজ্ঞ
ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের জন্মদিন

আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ ইসকন প্রতিষ্ঠাতা -আচার্য শ্রীল ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজের জন্মদিন আজ। ১৮৯৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর পরের দিনে ভারতের কলকাতার টালিগঞ্জে আদিগঙ্গাতীরে পর্ণকুটিরে কাঁঠাল গাছতলায় মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই মামা নাম দেন নন্দদুলাল। তাঁর বাবার নাম ছিল গৌরাঙ্গ মোহন দে এবং মায়ের নাম ছিল রজনী দে। তাঁর পিতৃ-মাতৃ প্রদত্ত নাম ছিল অভয় চরণ দে।

পিতা গৌরমোহনের ছিল উত্তর কলকাতায় কাপড়ের ব্যবসা, বসবাস ১৫১ হ্যারিসন রোডের এক তিন তলা বাড়িতে। প্রিয় পুত্রের আরও অনেকগুলো নাম দেওয়া হয়েছিল। ছোটবেলা থেকেই আধ্যাত্মিকতার  পরিবেশে বড় হওয়ায় তাঁর মধ্যে ধর্মভাব প্রকট ছিল।

১৯০১ সালে যখন তাঁর পাঁচ বছর তখনই গৌরমোহন দে তাঁকে মতিলাল শীল ফ্রি স্কুলে ভর্তি করে দেন। শৈশব থেকেই স্বামীজী ছিলেন অসাধারণ বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ মেধাসম্পন্ন কৃতি ছাত্র। ১৯০২ সালে ছয় বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতার কাছে পূজা করার জন্য ভগবানের শ্রীবিগ্রহ চেয়েছিলেন। তাঁর অনুরোধে গৌরমোহন ছোট রাধাকৃষ্ণের যুগল মূর্তি তাঁকে কিনে দেন।

১৯১৭ সালে তিনি কলকাতার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্কটিশ চার্চ কলেজে ভর্তি হন। ঐ কলেজে সুভাষচন্দ্র বসুর এক ক্লাস নীচে অভয়চরণ পড়তেন। কলেজে অধ্যয়ন করার সময়েই ১৯১৮ সালে ২২ বছর বয়সে অভয়চরণের পিতার পরিচিত এক বণিক পরিবারের কন্যা রাধারাণী দত্তের সঙ্গে তাঁর বিবাহের আয়োজন করেন। বিবাহের পর বেশ কয়েক বৎসর অভয় তাঁর বাড়িতেই ছিলেন এবং রাধারাণী তার বাপের বাড়িতে ছিলেন যেহেতু রাধারাণীর বয়স ছিল মাত্র ১১ বৎসর এবং অভয়ের বয়স ছিল ২২ বৎসর।

আরও পড়ুনঃ আজ (১৪ ভাদ্র)  ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার পঞ্জিকা ও ইতিহাসের এইদিনে

ভারতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ এর চেয়ে পুত্রের ভবিষ্যৎ বিষয়ে অধিক চিন্তিত হয়ে পিতা গৌরমোহন দে, তাঁর একজন ঘনিষ্ট হিতাকাক্ষী শৈল্য চিকিৎসক ও ক্যামিস্ট কার্তিক চন্দ্র বসুর সহায়তায় তাঁর জন্য একটা ভাল চাকরির ব্যবস্থা করেন। ডা. বসু আনন্দের সঙ্গে অভয়কে তার বিভাগীয় প্রধান রূপে অভিষিক্ত করেন। ১৯২১ সালে তাঁর পত্নী ১৪ বছর বয়সে তাঁদের প্রথম পুত্র সন্তানের জন্ম দেন।

১৯২০ সালে কলেজে তাঁর চর্তুথ বর্ষের পাঠ শেষ করে পরীক্ষায় সাফল্যের সঙ্গে উর্ত্তীণ হয়েছিলেন, কিন্তু তারঁ প্রাপ্য ডিগ্রী তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ১৯২০ সালে স্নাতক হওয়ার পর স্বাধীনতা আন্দোলনে গান্ধীজীর ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন।  ১৯২২ সালে মহান বৈষ্ণব আচার্য শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর প্রভুপাদ এর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাৎ লাভ করেন।

গৌড়ীয় বৈষ্ণব দীক্ষা লাভঃ ১৯৩২ সালে শ্রীল প্রভুপাদ তাকে শিষ্যত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। শ্রীল ভক্তিসিদ্ধান্ত সরস্বতী ঠাকুর অভয় চরণ কে একসাথে হরিনাম দীক্ষা ও গায়িত্রী/ব্রাহ্মণ দীক্ষা প্রদান করেন।

আরও পড়ুনঃ আজকের রাশিফল: ১৪ ভাদ্র মঙ্গলবার কোন রাশির প্রেম-অর্থ-কর্মে শুভযোগ?

১৯৩৫ সালের নভেম্বরে বৃন্দাবনে রাধাকুন্ডে তাঁর শ্রীল প্রভুপাদের সাথে দেখা হয়েছিল। সেখানে অভয় চরণকে বলেছিলেন, “যদি তুমি কোনদিন অর্থ সংগ্রহ করতে পার, পারমার্থিক বই ছাপিও।” ১৯৩৬ সালের ১লা জানুয়ারি ভোরে ৫ টা ৩০ মিনিটে তিনি পরলোক গমন করেন।

১৯৩৯ সালে অভয়চরণের প্রথম গ্রন্থ “গীতোপনিষদের সূচনা” স্বীকৃতি লাভ করে। ১৯৪৪ সালে প্রভুপাদ এককভাবে একটি ইংরেজি পাক্ষিক পত্রিকা “Back to Godhead” প্রকাশ করতে শুরু করেন। এমনকি তিনি নিজ হাতে তা বিতরণও করতেন।

১৯৪৭ সালে অভয় চরণের দার্শনিক জ্ঞান ও ভক্তির উৎকর্ষতার স্বীকৃতিরূপে ‘গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ’ তাঁকে “ভক্তিবেদান্ত”উপাধিতে ভূষিত করেন।

বানপ্রস্থ জীবনঃ ১৯৫০ সালে ৫৪ বছর বয়সে, সংসার জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করে চার বছর পর বানপ্রস্থ আশ্রম গ্রহণ করেন এবং শাস্ত্র অধ্যয়ন, প্রচার ও গ্রন্থ রচনার কাজে মনোনিবেশ করেন। তার আগে অভয় চরণ এক ছোট ফার্মাকিউটিক্যাল ব্যবসার মালিক ছিলেন।

আরও পড়ুনঃ সিন্ধু পানি চুক্তি একতরফাভাবে স্থগিত করতে পারবে না ভারত: আন্তর্জাতিক আদালত

১৯৫৩ সালের ১৬ই মে ঝাঁসিতে ছবির মত সুন্দর ভারতীভবনে অভয় চরণ “ভক্তসঙ্গ” নামে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৬ সালের শুরুতে অভয় চরণ নিউ দিল্লীতে তাঁর “ভগবৎ-দর্শন” পত্রিকাটি প্রচার করা শুরু করেন।

সন্ন্যাস জীবনঃ ১৯৫৯ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বর মথুরার কেশবজী গোড়ীয় মঠে তিনি তাঁর জ্যৈষ্ঠ গুরুভ্রাতা শ্রীল ভক্তিপ্রজ্ঞান কেশব গোস্বামী মহারাজের কাছে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। তার নাম দেন ভক্তিবেদান্ত স্বামী মহারাজ। ১৯৬২ সালে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামীর ভাষ্যকৃত শ্রীমদ্ভাগবতের প্রথম স্কন্ধ ছাপাখানায় ছাপা হয়েছিল। ১৯৬৪ সালের জুন মাসে নতুন দিল্লীর পার্লামেন্ট ভবনে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

১৯৬৫ সালের ১৩ আগস্ট ‘জলদূত’ নামক স্টীম নেভিগেশন কোম্পানির একটি মালবাহী জাহাজে প্রাশ্চাত্যে কৃষ্ণভক্তি প্রচার হেতু নিউইয়র্কের উদ্দেশ্যে সকাল ৯ ঘটিকায় কলকাতা ত্যাগ করেন। ১৯৬৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর দীর্ঘ ৩৫ দিন পর সকাল ৫:৩০ ঘটিকায় ঐ জাহাজ বোস্টন কমনওয়েলথ জেটিতে পৌঁছে, তারপর অন্তিমে নিউ ইয়র্ক শহরে ব্রুকলীন বন্দরে নোঙ্গর ফেলেছিলেন।

১৯৬৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ‘Butlar Eagle’ পত্রিকায় অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ বের হয়। এটিই ছিল আমেরিকা প্রচারের প্রথম সংবাদ। পত্রিকায় অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামীকে “বৈকুন্ঠ দূত” হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছিল।

ইসকন প্রতিষ্ঠাঃ ১৯৬৬ সালের জুলাই মাসে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী আমেরিকার মাঠিতে “আন্তর্জান্তিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত সংঘের মূল উদ্দেশ্য ছিল ৭ টি, যার নির্দেশনা ছিল প্রকৃত চিন্ময় স্বরূপের চিত্ত উৎঘাটন।

১৯৬৬ সালের ৮ই সেপ্টেম্বর জন্মাষ্টমীর পরের দিন তিনি পাশ্চাত্যে প্রথম দীক্ষা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন ও এগোর জনকে দীক্ষা দেন। ১৯৬৭ সালের ৯ই জুলাই সানফ্রানসিস্কো শহরের রাজপথে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী পাশ্চাত্যের প্রথম রথযাত্রা অনুষ্টান পরিচালনা করেন। ঐ বছরের ২৫ জুলাই অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামীর শরীর ভেঙ্গে পড়েছিল বলে তিনি ভারতে ফিরে আসেন।

১৯৬৯ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিনি শ্রী শ্রী রাধা-লন্ডনেশ্বর শ্রী বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭০ সালের জুলাই মাসে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী ইসকনের প্রকাশনা সংস্থা “ভক্তিবেদান্ত বুক ট্রাষ্ট” স্থাপন করেন। বর্তমানে রুশ ও চীনা ভাষাসহ পৃথিবীর ৫০ টির ও বেশি ভাষায় সেখানে প্রভুপাদের গ্রন্থগুলি ছাপাচ্ছে।

১৯৭০-১৯৭৫ সালের মধ্যে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী বিশ্বময় ব্যাপকভাবে কৃষ্ণভাবনা প্রচারের উদ্দেশ্য ভ্রমণ করেন। বিশ্বময় সংঘের মন্দিরগুলির পরিচালনার জন্য তিনি একটি পরিচালক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর প্রধান শিষ্যদের নিয়ে। ১৯৭২ সালে আমেরিকার ডালাসে গুরুকুল বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে বৈদিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করেন। প্রথমে তিনজন ছাত্র নিয়ে গুরুকুল প্রতিষ্ঠা হয়েছিল,বর্তমানে ১৫ টি গুরুকুলসহ ছাত্র সংখ্যা সহস্রাধিক। ১৯৭২ সালেই পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলায় শ্রীধাম মায়াপুরে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী মূল কেন্দ্রটি স্থাপন করেন। ১৯৭৪ সালে পশ্চিম ভার্জিনিয়ার পার্বত্য ভূমিতে গড়ে তোলেন নব-বৃন্দাবন, যা হলো বৈদিক শাস্ত্রের প্রতীক। ১৯৭৬ সালে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী তাঁর কতিপয় বৈজ্ঞানিক শিষ্যকে নিয়ে ইসকনের বিজ্ঞান ও শিক্ষা বিভাগ “ভক্তিবেদান্ত ইনস্টিটিউট” প্রতিষ্ঠা করেন।

১৯৭৭ সালের ১৪ই নভেম্বর কার্তিক মাসে গৌর-চতুর্থীর দিন সন্ধ্যা ৭:৩০ ঘটিকায় বৃন্দাবনের কৃষ্ণ-বলরাম মন্দিরে অভয় চরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী তাঁর শিষ্যদের অন্তিম শিক্ষা প্রদান করে এই জড় জগৎ থেকে বিদায় নিয়ে ভগবানের নিত্যলীলায় প্রবিষ্ট হয়েছিলেন।

তার লেখা বইগুলো হচ্ছে: শ্রীমদ্ভাগবত গীতা যথাযথ, শ্রী ঈশোপনিষদ, শ্রীমদ্-ভাগবতম, চৈতন্য চরিতামৃত, গীতার গান, বৈরাগ্য বিদ্যা, বুদ্ধি যোগ, ভক্তি রত্নাবলি ইত্যাদি।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।