তিব্বতের ইয়ারলুং সাংপো নদীর নিম্ন অববাহিকায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ বাঁধ নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করেছে চীন। ভারতের অরুণাচল প্রদেশ সীমান্ত থেকে মাত্র ৫০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই প্রকল্পকে ঘিরে ইতোমধ্যে আঞ্চলিক পানি নিরাপত্তা ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, চীনের এই মেগা প্রকল্পের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে প্রায় ৬০ হাজার মেগাওয়াট। বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে পরিণত হবে।
চীনের এই উদ্যোগের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতও নিজেদের কৌশলগত পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে। অরুণাচল প্রদেশের আপার সিয়াং ও সিয়াং জেলায় ‘সিয়াং আপার মাল্টিপারপাস প্রকল্প’ (এসইউএমপি) বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে ভারতের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হবে। এর সম্ভাব্য উৎপাদন ক্ষমতা ধরা হয়েছে প্রায় ১১ হাজার মেগাওয়াট এবং বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রকল্পটির সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় দেড় লাখ কোটি রুপি বা প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
তবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চীনের প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোলেও ভারতের প্রকল্পটি এখনো প্রাথমিক সমীক্ষা ও পরিকল্পনা পর্যায়ে রয়েছে।
ইয়ারলুং সাংপো নদী ভারতের ভূখণ্ডে প্রবেশের পর সিয়াং নামে পরিচিত হয় এবং পরবর্তীতে ব্রহ্মপুত্র নদে রূপ নেয়। আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল অতিক্রম করে নদীটি বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ফলে উজানে বৃহৎ বাঁধ নির্মাণের প্রভাব শুধু চীন বা ভারতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশসহ সমগ্র ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায়।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এত বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পরিবর্তিত হতে পারে। এতে নদীকেন্দ্রিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি কৃষি উৎপাদন, মৎস্যসম্পদ এবং পানির প্রাপ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এছাড়া হঠাৎ পানি ছেড়ে দিলে নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন তারা।
ভারত সরকার জানিয়েছে, ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার পরিস্থিতি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে চীনের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান, স্বচ্ছতা এবং আগাম পরামর্শের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই বৃহৎ জলবিদ্যুৎ প্রকল্প দক্ষিণ এশিয়ার পানি নিরাপত্তা, পরিবেশ এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্র নদনির্ভর ভারত ও বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি দীর্ঘমেয়াদে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।