দিপক রায়, রংপুর প্রতিনিধি : রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে মাইনর ক্যাটাগরি মেরামত, নিড বেইচ্ড, স্লিপ, রুটিন মেইন্টেন্যান্স, প্রাক-প্রাথমিক, ওয়াশ ব্লোক ও দুর্যোগকালীন ব্যবস্থাপনায় বরাদ্দকৃত অর্থে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। বিদ্যালয়গুলো করোনার জন্য বন্ধ থাকার কারণে এসব বরাদ্দকৃত অর্থে নামমাত্র কাজ করে টাকা হাতিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে পাওয়া তথ্য থেকে জানা যায়, ২০১৯-২০ অর্থ বছরে তারাগঞ্জ উপজেলার ৭৪টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ২১টি বিদ্যালয়ে মাইনর ক্যাটাগরি মেরামতের জন্য ৪২ লক্ষ টাকা, ১০টি বিদ্যালয়ের নিড বেইচ্ড (ক্ষুদ্র মেরামত) এর জন্য ১৫ লক্ষ টাকা, স্লিপের জন্য ২৫ লক্ষ ৬০ হাজার এবং ওয়াশ ব্লোকের জন্য ১ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ পায়।
সরেজমিনে উত্তর রহিমাপুর নয়াহাট মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ফরিদাবাদ ডাক্তারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভীমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মধুরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সৈয়দপুর ছপুর উদ্দিন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ধোলাইঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বুড়িরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পশ্চিম রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাংলাচড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, জমেরঘাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাকলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বকশিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, সয়ার মুচিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ রহিমাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বরাতী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, শেরমস্ত সরকারি বিদ্যালয়, চকতাহিরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ইকরচালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে নামমাত্র কাজ করে বরাদ্দকৃত অর্থ শিক্ষা অফিসকে ম্যানেজ করে হাতিয়ে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা।
উত্তর রহিমাপুর নয়াহাট মুক্তিযোদ্ধা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা হয় প্রধান শিক্ষক মৌসুমী আক্তারের সাথে। তিনি জানান, বরাদ্দকৃত অর্থের মধ্যে স্লিপের একটি তালিকা প্রদান করেন। তাতে দেখানো হয়েছে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বাগান নির্মাণের জন্য ৩ হাজার টাকা, চারাগাছ ক্রয়েরজন্য ৩ হাজার টাকা এবং ১৫০ জন দরিদ্র শিক্ষার্থীর জন্য খাতা বিতরণে প্রতি খাতা ২০ টাকা দরে ৩ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। খাতা বিতরণের তালিকা দেখতে চাইলে তিনি তার সহকর্মীকে নির্দেশ দেন তালিকা দেখার জন্য। কিন্তু উক্ত সহকারি একাধিক ছাত্রের হাজিরা খাতা এনে দেখালেও খাতা বিতরণের তালিকা দেখাতে ব্যর্থ হয়। এরপর প্রধান শিক্ষক মৌসুমীকে সঙ্গে নিয়ে বাগানে গেলে দেখা যায়, মাত্র দুইটি বাঁশ দিয়ে বেড়া তৈরি করে একটি বাগান তৈরি করেছে। সেখানে খরচ হয়েছে মাত্র ৮০০ টাকা। অথচ ভাউচার দেখানো হয়েছে ৩ হাজার টাকা। চারাগাছ ক্রয়ে ৩ হাজার টাকা দেখানো হলেও সেখানে দুই একটি চারাগাছ লাগিয়ে উক্ত টাকা হাতিয়ে নিয়েছে।
মাইনর মেরামতের জন্য একটি বিদ্যালয় কক্ষ তৈরি করা হয়েছে। তাতে ইটের পরিমাণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, মাত্র সাড়ে ৪হাজার ইট , সিমেন্ট, বালু, টিন, রড ও মিস্ত্রীসহ সবকিছু মিলে ২ লক্ষ টাকা দেখানো হয়েছে। অথচ কক্ষটি তৈরিতে প্রায় ১ লক্ষ ২০হাজার টাকা খরচ হয়েছে বলে জানিয়েছে সেখানে কাজ করা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মিস্ত্রী। তেঁতুলতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঘনিরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, তারাগঞ্জ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কাচনা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বুড়িরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নিড বেইচড থেকে যে সকল খেলনা (যেমন : ঢেঁকি, দোলনা, স্লিপার) ক্রয় করা হয়েছে তাতে ক্রয়মূল্য ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে। সেখানে বরাদ্দ ছিল ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা।
রংপুরের পাকার মাথার একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আতাত করে শিক্ষা অফিসকে ম্যানেজ করে উক্ত নি¤œমানের খেলনাগুলো সরবরাহ করে টাকা আত্মসাৎ শিক্ষকরা। জগদীশপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি খায়রুল আলম বিপ্লব বলেন, নিড বেইচ্ড থেকে যেবরাদ্দ পাওয়া গেছে তা থেকে আমরা যেসব খেলনা ক্রয় করেছি তা ১ লক্ষ ৫ হাজার টাকা । অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে যে সকল খেলনা ক্রয় করা হয়েছে এবং ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে তা সঠিক নয়। কারণ একই প্রতিষ্ঠান থেকে আমরাও একই খেলনা কিনেছি।
ফরিদাবাদ ডাক্তারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, স্লিপের বরাদ্দের টাকা দিয়ে বাগানসহ অন্যান্য খাতে ব্যয় দেখানো হলেও তিনি কাজ না করে আত্মসাৎ করেছেন।
এ প্রতিবেদক তারাগঞ্জ মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফেরদৌস আরাকে কাজ দেখার জন্য ফোন দিলে তিনি কাজ না দেখিয়ে বলেন, আমি কে আপনি জানেন ? আমি হলাম তারাগঞ্জের একজন বিশিষ্ট আইনজীবীর স্ত্রী। তাই আমি আপনাকে কাজ দেখাতে বাধ্য নই। কিছুক্ষণ পর তার স্বামী ( উক্ত আইনজীবী) ফোন করে বলেন, আপনি কি সাংবাদিক না অন্য কিছু ? আমার স্ত্রীকে আপনি কাজ দেখার জন্য ফোন দিয়েছেন। আপনি কি আমার সম্পর্কে জানেন? এভাবে একটানা ২৬ মিনিট কথা বলে মুঠোফোনটি কেটে দেন।
এসকল বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা আঞ্জুয়ারার সাথে কথা হলে তিনি বলেন, যে সকল প্রতিষ্ঠান এখনও কাজ করে নাই তাদের বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নিব।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা শাজাহান বলেন, যদি কোথাও এ ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকে তাহলে আমি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিব যেন তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।


