গ্রামীণ জনমানুষের  ঐতিহ্যবাহী খাবার শিদল

মাহফুজার রহমান মাহফুজ, ফুলবাড়ী,কুড়িগ্রাম সংবাদদাতাঃ ধরলা বেষ্ঠিত ভারতীয় সীমান্তঘেষা উত্তরের জনপদ ফুলবাড়ী উপজেলা। ধরলার বয়ে চলার কল্যাণে একসময় বর্ষাকালে কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীর নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, ডোবা বিভিন্ন প্রজাতির মাছে ভরপুর ছিল। এসব জায়গায় জাল ফেললেই ওঠে আসতো নানান রকমের দেশিয় প্রজাতির মাছ।
বর্ষামৌসুমে এখানকার বাসিন্দারা  বিভিন্ন কৌশলে প্রচুর পরিমাণে মাছধরতো তাছাড়া   ডোবা ও পুকুর সেচেও প্রচুর পরিমাণে  মাছ পাওয়া যেতো,সেই মাছ পাড়া-প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে পাঠানো হত।তারপরেও যে মাছ থাকতো  তা একসঙ্গে খাওয়া যেত না। বাছাই করে বড় মাছ রান্না করে খাওয়া হত। কিছু প্রজাতির মাছ জিইয়ে রাখা হত আর ছোট মাছগুলো শুকিয়ে করা হতো শুঁটকি। ভরা বর্ষামৌসুমে বাজারেও সস্তা দামে পাওয়া যেত নানান রকমের মাছ।হাতের নাগালে কমদামে মাছ পাওয়ার ফলে অনেকেই মাছ কিনে বানাতো শুটকি।প্রায় প্রতিটি বাড়ীতে দেখা যেত শুঁটকি।
গ্রামের বাতাসে ভেসে বেড়াতো শুঁটকির ঘ্রাণ। এই শুঁটকি দিয়েই গ্রামের বধূরা বানাতো গ্রামীন ঐতিহ্যবাহী খাবার শিদল। বিভিন্ন প্রকারের ছোটমাছের  শুঁটকির গুড়োর সাথে কচুর ডাঁটা বেটে ভালোভাবে মেশানো হয়। এরপর সরিষার তেল ও হলুদ হাতের তালুতে মাখিয়ে মিশ্রণটি থেকে বিভিন্ন আকৃতিতে তৈরী হয় শিদল । এভাবে তৈরী হওয়া কাঁচা শিদল ১০ থেকে ১৫ দিন প্রখর রোদে ভালো করে শুকিয়ে নেয়া হয়।তারপরে ছাই ও শিদল হাড়িভর্তি করে রাখা হয়। এভাবে সংরক্ষিত রাখার ফলে দীর্ঘদিন পর্যন্ত শিদল নস্ট হয় না।আপদকালীন তরকারি হিসেবে শিদল অতুলনীয়।উত্তরাঞ্চলের সকল মানুষের প্রিয় ও ঐতিহ্যবাহি খাবার এই শিদল।
শিদল দিয়ে অনেক তরকারি রান্না করে খাওয়া যায়।তবে শিদল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় ভর্তায়। শিদল ভর্তা পছন্দ করেন না এমন মানুষ উত্তরাঞ্চলে খুঁজে পাওয়া ভার। আগে কৃষকেরা সকালে শিদল ভর্তা- ভাত খেয়ে কাজে যেতেন। শিদল ভর্তা ছিল উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জনপদের একটি মুখরোচক খাবার। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ও অতিথি আপ্যায়নে খাবার তালিকায় শিদল ভর্তা ছিল বিশেষ গর্বের । এজন্য গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই তৈরি করা হতো ছোট মাছ দিয়ে বানানো এ শিদল। শিদল দিয়ে অনেক সুস্বাদু তরকারি রান্না করা হয় এঅঞ্চলে যার স্বাদ ও গন্ধ অতুলনীয়।শিদলের কথা শুনলে ভাত না খেতে চাওয়া মানুষও ভাত খেতে বসে- এমনই সুস্বাদু শিদল । এর জনপ্রিয়তা এখনো আছে। আজও অনেকেই খুঁজে ফিরেন শিদলের সেই স্বাদ।
শাহ বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সুজাউদদৌলাহ  বলেন, ফুলবাড়ীর মানুষের খাবারের তালিকায় শিদলভর্তা অনেক জনপ্রিয়। আগে প্রতিটি বাড়িতেই শিদল তৈরি হলেও এখন আর তেমনটা দেখা যায় না। পর্যাপ্ত মাছ না পাওয়ায় নিজেদের জন্য আমরা এ বছর অল্প কিছু শিদল বানিয়েছি।
উপজেলার নাগদাহ গ্রামের  বাসিন্দা হাফিজুর রহমান আঙ্গুর বলেন, ডাল ও শিদলভর্তা হলে আর কোনো তরকারির দরকার নেই। আগে সকালে শিদল ভর্তা ও গরম ভাত খেয়ে মাঠে কাজে যেত অনেকেই। এমনকি আমাদের বাড়ীতে দিনমজুরদেরও আবদার ছিল শিদল ভর্তার।উপজেলার চন্দ্রখানা গ্রামের বাসিন্দা মনছার আলী বলেন, উপজেলার ঘোগারকুটি গ্রামের বাসিন্দা উকিল মিয়া বলেন, শিদল দিয়া রান্না করা কচুর মুড়োর স্যাকার তরকারির যে স্বাদ তার তুলনা করার মত কি আর আছে? একই গ্রামের লাকু মিয়া বলেন বুড়ো বেগুনের সাথে শিদল দিয়ে রান্না করা স্যাকার তরকারি তার খুব প্রিয়।
পূর্ব চন্দ্রখানা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শ্রী বিনোদ চন্দ্র রায় বলেন,জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এ অঞ্চলের আবাল বৃদ্ধ বনিতার প্রিয় খাবার শিদল।তবে ছোট মাছের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় বর্তমানে শিদল আর তেমন খাওয়া হয় না।
কালের বির্বতনে সকলের অগোচরে দিনে দিনে বিলুপ্তির পথে ঐতিহ্যবাহী শিদল।বর্তমানে জন্ম নেয়া অনেকের কাছে হয়তো অপরিচিত থেকে যাবে শিদল।দেশীয় ছোট জাতের মাছের বিলুপ্তি কারণে তৈরি হচ্ছে না শিদল।তাছাড়া আধুনিক যুগের মডার্ণ গৃহ বধূরা শিদল তৈরিকে খুব ঝামেলার কাজ মনে করেন বলেই বিলুপ্ত হচ্ছে শিদল -এমনও মত অনেকের।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।