ঢাকা, ২৪ আগস্ট: ভারতীয় উপমহাদেশের ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে সাহসী নারী বিপ্লবীদের অন্যতম বীণা দাসের জন্মদিন আজ। ১৯১১ সালের ২৪ আগস্ট তৎকালীন বঙ্গপ্রদেশের নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষক ও ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে যুক্ত দেশপ্রেমিক বেণী মাধব দাস এবং মা সরলা দাস। বিপ্লবী কল্যাণী দাস ছিলেন তাঁর বড় বোন।
ছাত্রজীবন থেকেই বীণা দাস জাতীয়তাবাদী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হন। কলকাতার বেথুন কলেজে পড়াশোনার সময় তিনি ব্রিটিশবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে যুক্ত হন। ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে নারী বিপ্লবীদের সংগঠন ছাত্রী সংঘের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা তৈরি হয়।
তবে বীণা দাস ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে আছেন ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারির একটি দুঃসাহসী ঘটনার জন্য। ওই দিন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বাংলার তৎকালীন গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসন উপস্থিত ছিলেন। সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বীণা দাস জ্যাকসনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানোর চেষ্টা করেন। তাঁর গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় এবং জ্যাকসন প্রাণে বেঁচে যান। ঘটনাস্থলেই বীণা দাস গ্রেপ্তার হন।
এই ঘটনার পর তাঁকে নয় বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯৩৯ সালে কারামুক্ত হওয়ার পরও তিনি রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী কর্মকাণ্ড থেকে সরে যাননি। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল এবং এ সময়ও তিনি কারাবন্দি হন।
আরও পড়ুনঃ চীনা দূতাবাসে হামলার হুমকি, ঢাকায় কূটনৈতিক মিশনে নিরাপত্তা জোরদার
স্বাধীনতার প্রাক্কালে বীণা দাস মূলধারার রাজনীতিতেও যুক্ত হন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত তিনি বিধানসভার সদস্য ছিলেন। দেশভাগের পর সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও উদ্বাস্তু সংকটের সময়ও তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। নোয়াখালির সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার পর ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমেও তাঁর ভূমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়।
বীণা দাস শুধু রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তিনি একজন লেখকও ছিলেন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘শৃঙ্খল ঝংকার’ স্বাধীনতা আন্দোলনের অভিজ্ঞতা ও তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়। বেথুন কলেজের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর আরেকটি গ্রন্থের নাম পিতৃধন।
আরও পড়ুনঃ ইরানে মৃত্যুদণ্ডের মিছিল, রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
১৯৪৭ সালে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের কর্মী যতীশ চন্দ্র ভৌমিককে বিয়ে করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর জীবন ক্রমেই নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে। জীবনের শেষ পর্বে তিনি ঋষিকেশে বসবাস করতেন। ১৯৮৬ সালের ২৬ ডিসেম্বর সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় তাঁর শেষ জীবনকে নিঃসঙ্গতা ও দারিদ্র্যে আচ্ছন্ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বীণা দাসের জীবন ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ, কারাবরণ, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী সামাজিক ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে। তাঁর জন্মদিনে এই সাহসী বিপ্লবীর প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে।



