মুসলিম বিশ্বের প্রথম খলিফা, প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম এবং মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)-এর মৃত্যু দিবস আজ। ইসলামের ইতিহাসে তাঁর জীবন, ত্যাগ, সততা ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবিচল আনুগত্য বিশেষভাবে স্মরণীয়।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আবু বকর (রা.) ৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর নাম ছিল আবদুল্লাহ। ‘আবু বকর’ ছিল তাঁর কুনিয়াত। তাঁর পিতা আবু কুহাফা এবং মাতা উম্মুল খায়ের সালমা বিনতে সাখার নামে পরিচিত ছিলেন।
ইসলামের সূচনালগ্নেই আবু বকর (রা.) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর আহ্বানে সাড়া দেন। তাঁর সত্যনিষ্ঠা ও ইসলামের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের কারণে তিনি ‘সিদ্দীক’ উপাধিতে পরিচিত হন। ইসলাম গ্রহণের পর তিনি নিজের সম্পদ, প্রভাব ও সামাজিক অবস্থান ইসলামের প্রচার ও মুসলমানদের কল্যাণে কাজে লাগান।
আরও পড়ুনঃ ঢাবিতে আজ ‘কালো দিবস’, স্মরণে ২০০৭ সালের দমন-পীড়নের ঘটনা
ব্যবসায়ী থেকে ইসলামের অন্যতম প্রধান সহচর
তরুণ বয়সে আবু বকর (রা.) ব্যবসা করতেন। বাণিজ্যের প্রয়োজনে তিনি সিরিয়া, ইয়েমেনসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণ করেন। ব্যবসার মাধ্যমে তিনি আর্থিকভাবে স্বচ্ছল হন এবং নিজ গোত্রে একজন সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও পরিচিতদের ইসলামের প্রতি আহ্বান জানান। তাঁর দাওয়াতে বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট সাহাবি ইসলাম গ্রহণ করেন বলে ইসলামী ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।
মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হয় তাঁর কন্যা হজরত আয়েশা (রা.)-এর সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিবাহের মাধ্যমে। হিজরতসহ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি মহানবী (সা.)-এর বিশ্বস্ত সহচর হিসেবে পাশে ছিলেন।
ইসলামের জন্য সম্পদ বিলিয়ে দেন
আবু বকর (রা.) ইসলামের প্রচার ও মুসলমানদের কল্যাণে নিজের বিপুল সম্পদ ব্যয় করেন। নির্যাতিত মুসলমানদের মধ্যে অনেক দাসকে তিনি অর্থের বিনিময়ে মুক্ত করে দেন। বিলাল (রা.)-সহ নির্যাতিত কয়েকজন মুসলমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ঐতিহাসিক বর্ণনায় পাওয়া যায়।
আরও পড়ুনঃ আজ থেকে শুরু ঝুলন যাত্রা, রাধাকৃষ্ণের প্রেমলীলায় মুখর বৈষ্ণব সমাজ
মদিনায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময়ও তিনি মহানবী (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। বিভিন্ন সামরিক অভিযান ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনাতেও তিনি অংশ নেন। হুদায়বিয়ার সন্ধির সময়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।
প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্ব
৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজে নেতৃত্বের প্রশ্নে মতপার্থক্য দেখা দেয়। সাকিফা বনি সায়েদায় আলোচনার পর আবু বকর (রা.)-এর হাতে বাইআত করা হয় এবং তিনি মুসলিমদের প্রথম খলিফা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
খলিফা হিসেবে তাঁর শাসনকাল ছিল প্রায় দুই বছর। এ সময় তিনি একাধিক রাজনৈতিক ও ধর্মীয় সংকটের মুখোমুখি হন। বিভিন্ন গোত্রের বিদ্রোহ এবং মিথ্যা নবুওয়াতের দাবিদারদের বিরুদ্ধে তিনি কঠোর ব্যবস্থা নেন। তাঁর নেতৃত্বে ইসলামী রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ও সুসংহত হয়।
মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর ইসলামী রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে আবু বকর (রা.)-এর নেতৃত্ব বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
ওফাত ও দাফন
জীবনের শেষ দিকে অসুস্থ হয়ে পড়েন হজরত আবু বকর (রা.)। তাঁর মৃত্যুর আগে উত্তরসূরি নির্ধারণের বিষয়টি নিয়ে সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়। পরবর্তীতে হজরত ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-কে পরবর্তী খলিফা হিসেবে মনোনীত করা হয়।
ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত বর্ণনা অনুযায়ী, হজরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.) ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কবরের পাশেই মদিনার মসজিদে নববীর সংলগ্ন রওজা শরিফে দাফন করা হয়।
ইসলামের ইতিহাসে তাঁর জীবন সততা, আত্মত্যাগ, আনুগত্য, নেতৃত্ব ও মানবিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণ করা হয়। মুসলিম সমাজে তাঁর অবদান আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয়।



