আজ ২৩ আগস্ট, রবিবার থেকে শুরু হয়েছে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী বৈষ্ণব উৎসব ঝুলন যাত্রা। শ্রাবণ মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসব পালিত হয়। রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে আয়োজিত ঝুলন উৎসব বাংলার ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
মথুরা-বৃন্দাবনের মতো বাংলাতেও ঝুলন উৎসবের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কাছে দোল পূর্ণিমার পর এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হিসেবে বিবেচিত হয়। দেশের বিভিন্ন মঠ-মন্দির, আশ্রম ও বনেদি বাড়িতে নানা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ঝুলন যাত্রা উদযাপন করা হয়।
রাধাকৃষ্ণকে দোলনায় বসানোর ঐতিহ্য
‘ঝুলন’ শব্দটির সঙ্গে দোলনার সম্পর্ক রয়েছে। প্রচলিত ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ঝুলন উৎসবের সময় ভক্তরা রাধা ও কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ সুসজ্জিত দোলনায় স্থাপন করেন এবং পূজা-অর্চনা করেন।
শাস্ত্রজ্ঞদের মতে, বৃন্দাবনে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমলীলাকে কেন্দ্র করে দ্বাপরযুগে ঝুলন উৎসবের সূচনা হয়। সময়ের সঙ্গে এই উৎসব ভারতীয় বৈষ্ণব সংস্কৃতির বিভিন্ন অঞ্চলে বিস্তার লাভ করে। বাংলাতেও ঝুলন যাত্রা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় আচার, লোকসংস্কৃতি ও সামাজিক উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে।
পাঁচ দিনব্যাপী নানা আয়োজন
শ্রাবণের শুক্লা একাদশী থেকে পূর্ণিমা পর্যন্ত ঝুলন উৎসব চলে। বিভিন্ন মঠ-মন্দির ও বনেদি বাড়িতে রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহ ফুল, পাতা ও নানা উপকরণ দিয়ে সাজানো দোলনায় স্থাপন করা হয়।
উৎসবকে ঘিরে কোথাও কোথাও নামসংকীর্তন, ভজন, পূজা ও প্রসাদ বিতরণের আয়োজন করা হয়। ভক্তরা বিভিন্ন ধরনের ফল, লুচি, সুজি ও অন্যান্য নৈবেদ্য নিবেদন করেন। কোনো কোনো আয়োজনে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের ফল দিয়ে বিশেষ ভোগের ব্যবস্থাও থাকে।
শিশুদের কাছেও ঝুলনের আলাদা আকর্ষণ
ঝুলন যাত্রা শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার লোকজ ও পারিবারিক সংস্কৃতিতেও এর বিশেষ প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে ঝুলন সাজানোর আগ্রহ দেখা যায়।
মাটির পুতুল, কাঠের দোলনা, গাছপালা, ফুল ও নানা রকম সাজসজ্জার উপকরণ দিয়ে ছোট ছোট ঝুলন তৈরি করা হয়। কোথাও কোথাও ঝুলনকে কেন্দ্র করে তৈরি করা হয় ছোট আকারের গ্রামীণ বা পৌরাণিক দৃশ্য। ফলে ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি এটি শিশু-কিশোরদের সৃজনশীলতা ও পারিবারিক আনন্দেরও অংশ হয়ে উঠেছে।
ধর্মীয় উৎসবের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য
রাধা-কৃষ্ণের যুগলবিগ্রহ দোলনায় স্থাপন ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে ঝুলন যাত্রার মূল ধর্মীয় আচার পালিত হলেও এর সঙ্গে বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও গভীরভাবে যুক্ত।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই উৎসব বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের পাশাপাশি বাংলার লোকজ সংস্কৃতি ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্যকেও ধারণ করে আসছে।



