বাংলাদেশি হিন্দুরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ভাগা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। একটি জনগোষ্ঠীকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য করা সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বরং বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। বলেছেন বিজেপির প্রবীণ নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের সাবেক রাজ্যপাল তথাগত রায়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি বাংলাদেশি হিন্দুদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ওপর কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর জন্য ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তথাগত রায়ের বক্তব্যে বাংলাদেশি হিন্দুরা বিশ্বের সবচেয়ে দুর্ভাগা জনগোষ্ঠীগুলোর একটি। বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন, সহিংসতা, অপমান, শারীরিক নির্যাতন, বাড়িঘর ও সম্পত্তি ধ্বংস বা দখল এবং নারীদের ওপর যৌন সহিংসতার বিভিন্ন অভিযোগের কথা উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুনঃ তিন সামরিক কর্মকর্তার ভারতে আশ্রয়ের দাবি, উঠছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো ঘটনার বিস্তারিত তথ্য বা পরিসংখ্যান তিনি দেননি। তাঁর বক্তব্য মূলত বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে উঠে এসেছে।
অতীতের নিপীড়নের উদাহরণ টানলেন তথাগত
বাংলাদেশি হিন্দুদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ওপর অতীতে সংঘটিত নিপীড়নের উদাহরণও তুলে ধরেছেন তথাগত রায়।
তিনি নাৎসি জার্মানিতে ইহুদিদের ওপর নিপীড়ন, আর্মেনীয়দের ওপর তৎকালীন তুর্কি শাসনের নির্যাতন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ আফ্রিকায় কৃষ্ণাঙ্গদের বিরুদ্ধে বৈষম্য ও নিপীড়নের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।
আরও পড়ুনঃ বাংলাদেশি হিন্দুদের নিরাপত্তায় মোদী সরকারকে চাপ বাড়ানোর আহ্বান তথাগত রায়ের
তাঁর মতে, এসব ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে বাংলাদেশি হিন্দুদের পরিস্থিতির তুলনা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, বাংলাদেশি হিন্দুদের একটি অংশ নিজেদের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে পর্যাপ্তভাবে প্রতিবাদ করেন না।
গান্ধীবাদ ও কমিউনিজম নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য
তথাগত রায়ের পোস্টের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশগুলোর একটি হলো বাংলাদেশি হিন্দুদের রাজনৈতিক ও সামাজিক মানসিকতা নিয়ে তাঁর মন্তব্য।
তাঁর দাবি, ‘গান্ধীবাদ’ ও ‘কমিউনিজম’-এর প্রভাব বাংলাদেশি হিন্দুদের নিজেদের ওপর সংঘটিত নির্যাতন আড়াল করা এবং নির্যাতনকারীদের কর্মকাণ্ডের যথেষ্ট নিন্দা না করার মানসিকতা তৈরি করেছে।
তাঁর এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই বিতর্কের অবকাশ তৈরি করেছে। কারণ গান্ধীবাদ, কমিউনিজম এবং সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে ভারত ও বাংলাদেশে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের নিয়েও প্রশ্ন
বাংলাদেশের পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুদের ভূমিকা নিয়েও মন্তব্য করেছেন বিজেপির এই প্রবীণ নেতা।
তাঁর দাবি, পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন। ভিয়েতনাম থেকে গাজা—বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে প্রতিবাদ কর্মসূচি দেখা গেলেও পূর্ব পাকিস্তান ও পরবর্তী বাংলাদেশের হিন্দুদের ওপর সংঘটিত কথিত নির্যাতনের বিরুদ্ধে একই মাত্রার প্রতিবাদ দেখা যায় না বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
‘ভারতে নিয়ে আসা’ স্থায়ী সমাধান নয়
বাংলাদেশি হিন্দুদের ভারতে সরিয়ে আনার দাবিকেও স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখছেন না তথাগত রায়।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, একটি জনগোষ্ঠীকে নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে বাধ্য করা সমস্যার সমাধান হতে পারে না। বরং বাংলাদেশে বসবাসরত হিন্দুদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য।
এ জন্য ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের ওপর ধারাবাহিক কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পক্ষে মত দিয়েছেন তিনি।
মোদী, জয়শঙ্কর ও শুভেন্দুকে ট্যাগ
নিজের পোস্টে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর উদ্দেশে সরাসরি আহ্বান জানিয়েছেন তথাগত রায়। একই পোস্টে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্কর এবং পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীকেও ট্যাগ করেছেন তিনি।
তাঁর প্রশ্ন, ভারত সরকার কি বাংলাদেশের ওপর ধারাবাহিক ও কঠোর কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করবে, যাতে বাংলাদেশে হিন্দুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও নিপীড়নের অভিযোগের অবসান ঘটে এবং তাঁরা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারেন?
বাঙালি হিন্দুদের অস্তিত্ব নিয়ে আশঙ্কা
তথাগত রায় তাঁর পোস্টের শেষাংশে বাঙালি হিন্দুদের ভবিষ্যৎ নিয়েও আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ধর্মীয় ও ভাষাগত পরিচয়ের দিক থেকে বাঙালি হিন্দুদের অস্তিত্ব ভবিষ্যতে সংকটের মুখে পড়তে পারে।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, একটি স্বতন্ত্র ‘ধর্মীয়-ভাষাগত জনগোষ্ঠী’ হিসেবে বাঙালি হিন্দুদের পরিচয় একসময় বিলীন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
তবে বাংলাদেশে হিন্দুদের পরিস্থিতি নিয়ে তথাগত রায়ের এসব বক্তব্য তাঁর নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান ও মূল্যায়ন। বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে ভিন্নমত রয়েছে।

