করারোপে উচ্চশিক্ষা বাধাগ্রস্ত হবে

বিশেষ প্রতিবেদকঃ চাপে পড়েছে বেসরকারি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে সাড়ে সাত শতাংশ মূল্য সংযোজন কর নির্ধারণ করায় এ চাপ তৈরি হয়েছে। আর এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে।

বিষয়টিকে ‘অন্যায্য’ আখ্যায়িত করে শিক্ষার্থীরা বলছেন, সরকারের প্রস্তাবিত এ বাজেট বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অস্থির করে তুলবে। তাদের মতে, ভ্যাটের কারণে একদিকে অর্থনৈতিক চাপ বৃদ্ধি পাবে এবং অন্যদিকে উচ্চশিক্ষা বাধাগ্রস্ত হবে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. একে আজাদ চৌধুরী বলেন, ‘দেশের ৮৬টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০টি উচ্চহারে টিউশন ফি আদায় করে। বাকিগুলোতে ফি তত বেশি নয়। এর প্রধান কারণ, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকাংশই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানরা লেখাপড়া করেন। সেক্ষেত্রে শতকরা ৭ দশমিক ৫ ভাগ হারে ভ্যাট আরোপ শিক্ষার্থীদের ওপরই বর্তাচ্ছে। এতে আগামীতে উচ্চশিক্ষা সঙ্কুচিত হতে পারে।’

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন সংকট, সেশন জটসহ বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশে সরকারি প্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। এর বিপরীতে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বর্তমানে উচ্চবিত্তের পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তের নাগালে চলে এসেছে। যে কারণে কয়েক লাখ শিক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে উচ্চশিক্ষার জন্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হচ্ছে, যা শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা আরও জানায়, অর্থমন্ত্রীর এমন সিদ্ধান্তের কারনে করের বোঝা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। তাদের মতে, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ার সুযোগ পায়। আর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত কলেজ ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি হয় ৬০ শতাংশ। প্রস্তাবিত কর বাস্তবায়িত হওয়ার ফলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনায় খরচও বেড়ে গেছে। এর ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছে অসংখ্য শিাক্ষার্থী।

স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজ সিকদার বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল মাত্র উচ্চবিত্তের সন্তানরাই পড়ছে না, উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য মফস্বল থেকে আসা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের সন্তানরাও ভর্তি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি পরিশোধের জন্য অভিভাবকরা জমিজমা বন্ধক এমনকি বিক্রি পর্যন্ত করছে। এ অবস্থায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ কর আরোপ করার ফলে টাকার পরিমাণ বহুগুণ বেড়ে গেছে। এ অবস্থা সৃষ্টি হবার কারণে অনেকের পক্ষে উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করাই সম্ভব হবে না। সাড়ে সাত শতাংশ কর নির্ধারণ দুই ধরনের চাপ তৈরি করেছে শিক্ষার্থীদের ওপর উল্লেখ করে রিয়াদ আরিফ বলেন, কর বৃদ্ধির কারণে কর্তৃপক্ষ বেতন-ফি বাড়িয়ে দিয়েছে। আর আমাদের শিক্ষার্থীদের এই চাপ নিতে হচ্ছে এবং এই ভ্যাটের বিষয়টিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় পলিচালনাকারীরা। তারা এখন সব খরচের সঙ্গে ভ্যাট যোগ করছে। অযথা অতিরিক্ত টাকা আদায় করা হচ্ছে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। এছাড়া আমাদের থেকে বড় চিন্তায় পরেছে আমাদের অভিভাবকরা। এমনিতেই তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খরচের চিন্তায় ঘুমাতে পারে না। এ অবস্থায় করের বাড়তি টাকার চিন্তায় অনেকে তার সন্তানের পড়ালেখাই বন্ধ করে দিবে।

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী চয়ন বিশ্বাস বলেন, আমাদের দেশে সরকার একদিকে যেমন সব শিক্ষার্থীর দায়িত্ব নিচ্ছে না, অন্যদিকে শিক্ষার্থীরা যখন পরিবারের অর্থে উচ্চশিক্ষা লাভের চেষ্টা করছে, তখন নানাভাবে সেখানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে যাচ্ছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসন না থাকায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের লক্ষ্যে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিকভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হতে হবে। তিনি বলেন, অতীতেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর সাড়ে চার শতাংশ হারে কর আরোপ করা হয়েছিল। তখন প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছিল। পরে আন্দোলনের চাপে ওই কর বাতিল করা হয়েছিল। আমরা আশাবাদী যে, এবারও ছাত্রসমাজ সংগঠিতভাবে এই অন্যায্য কর আরোপের জবাব দেবে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর কর আরোপ করার বিষয়টি শিক্ষা নিয়ে রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গির প্রমাণ দেয়। আইনি অনুমোদনের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে অমুনাফাভোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বলা হচ্ছে। আবার সেই প্রতিষ্ঠানের ওপর মূসক ধার্য করা হাস্যকর। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে জানা গেছে, দেশে বর্তমানে ৮৪টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাসেবা দিয়ে আসছে। এর আগেও বিভিন্ন সরকারের আমলে এমন অতিরিক্ত করের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা বাতিল হয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক সমিতির সভাপতি কবির আহমেদ বলেন, সরকার দ্বিমুখী আচরণ করছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তুকি দিচ্ছে আর বেসরকারিতে ভ্যাট ধার্য করেছে। পুরো চাপটা যাবে সাধারণ মানুষের ওপর। অনেক শিক্ষার্থীরই পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে। চরমভাবে বিঘ্নিত হবে উচ্চশিক্ষা। কারন পয়সাগুলো তো আর বিশ্ববিদ্যালয় মালিকরা দেবে না, দেবে শিক্ষার্থীরা। তারা কোথায় পাবে এত টাকা? এমনিতেই ঢাকা শহরে থাকা-খাওয়ার খরচ এখন আকাশচুম্বী। এরপর ভ্যাট দিতে দিয়ে ছাত্রদের পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হবে। অসহায় বোধ করবেন অভিভাবকরা। ছাত্ররা বিষয়টিকে সহজভাবে নেবে না। এর পরিণাম হবে ভয়াবহ।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।