আজ ১২ আগস্ট আন্তর্জাতিক যুব দিবস। বিশ্বের তরুণ জনগোষ্ঠীর সম্ভাবনা, অধিকার, সমস্যা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতিবছর জাতিসংঘের উদ্যোগে দিবসটি পালিত হয়। যুবসমাজের উন্নয়ন এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও দিবসটির অন্যতম উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০০ সালের ১২ আগস্ট প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক যুব দিবস পালিত হয়। এরপর থেকে প্রতিবছর দিনটি বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়ে আসছে।
একটি দেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা তার তরুণ জনগোষ্ঠী। উদ্যম, সৃজনশীলতা, সাহস ও নতুন কিছু করার মানসিকতা তরুণদের সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও জনমিতিক লভ্যাংশের সুবিধা কাজে লাগানোর জন্য তরুণদের দক্ষতা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্বে ১০ থেকে ২৪ বছর বয়সী মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশই তরুণ। বাংলাদেশে জাতীয় যুবনীতি অনুযায়ী ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সীদের যুব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এই বয়সসীমার অন্তর্ভুক্ত।
সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের ভূমিকা
সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে যুবসমাজের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যায়, দুর্নীতি, মাদক, কুসংস্কার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি তরুণরা শিক্ষা, স্বেচ্ছাসেবা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
দুর্যোগের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, দরিদ্র ও অসহায়দের সহায়তা করা, পরিবেশ রক্ষা এবং সামাজিক সচেতনতা তৈরিতেও তরুণদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিকাশের ফলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্রও তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ বিশ্ব হাতি দিবস আজ, হাতি সংরক্ষণে সচেতনতার আহ্বান
জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ, মানবাধিকার, শান্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের মতো বৈশ্বিক বিষয়েও বিশ্বের তরুণরা ক্রমেই সোচ্চার হয়ে উঠছে। বাংলাদেশেও তরুণ উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, প্রযুক্তিবিদ ও বিভিন্ন পেশাজীবী দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ
তরুণদের সামনে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ। বেকারত্ব, দক্ষতার ঘাটতি, মানসম্মত শিক্ষার সীমিত সুযোগ, মাদকাসক্তি, অপুষ্টি এবং পর্যাপ্ত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগের অভাব তাদের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
বিশেষ করে শহরাঞ্চলে খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গার সংকট তরুণদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। গ্রাম ও মফস্বল এলাকাতেও আধুনিক প্রশিক্ষণ, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে শিক্ষিত তরুণদের একটি অংশ দীর্ঘ সময় ধরে কর্মসংস্থানের অপেক্ষায় থাকে। চাকরি, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের সংখ্যাও উদ্বেগের বিষয়। কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হলে তরুণদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারও তরুণদের জন্য নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তথ্যের সহজলভ্যতার পাশাপাশি সাইবার বুলিং, সামাজিক তুলনা, ভুল তথ্য এবং অনলাইন আসক্তি তরুণদের মানসিক ও সামাজিক জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তরুণদের জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা
বাংলাদেশের জনমিতিক লভ্যাংশের সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তি, ভাষা, উদ্যোক্তা দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী প্রশিক্ষণের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।
সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তাদের সহায়তা এবং দক্ষতা উন্নয়নের কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা দরকার। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের মধ্যে আস্থা ও উৎসাহ বাড়বে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খেলাধুলা, সংস্কৃতি ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি মাদকবিরোধী কার্যক্রম জোরদার করাও জরুরি। তরুণদের ইতিবাচক কাজে সম্পৃক্ত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র—সব পক্ষকেই সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তারুণ্যই আগামীর শক্তি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের মেধা, শ্রম, উদ্ভাবনী চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের উন্নয়ন আরও গতিশীল হবে।
আন্তর্জাতিক যুব দিবসে তাই শুধু তরুণদের সম্ভাবনার কথা বলাই নয়, তাদের সমস্যা চিহ্নিত করে বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ তৈরি করাও জরুরি। দক্ষ, শিক্ষিত, মানবিক ও দায়িত্বশীল তরুণ প্রজন্মই পারে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ নির্মাণে নেতৃত্ব দিতে।


