বাংলার অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর চন্ডালত্ব মোচনে ঠাকুর বংশের অবদান

অভিজিৎ পান্ডে, দি নিউজ ডেক্সঃ শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এবং তার সুযোগ‍্য পুত্র মহাত্মা গুরুচাঁদ ঠাকুর জন্মগ্রহণ না করলে, বাংলার বিশাল অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠী চন্ডাল গালি থেকে রেহাই পেতে সনাতন ধর্ম ছেড়ে অন‍্যধর্মে চলে যেত। এই ব্রাক্ষন্যবাদের অত্যাচার এতোই ভয়াবহ ছিল যে নমশূদ্রদের তাঁদের পুকুরের জল খেতে দিতনা, স্নান করতে দিতনা এমনকি বাড়ির উপর দিয়ে হাটলেও ছিঃ ছিঃ বলে গোবর ছিটাতো। তাঁদের ঘৃনার চোখে দেখা হতো এক কথায় রাস্তার কুকুরের মত আচরন করা হত এই নমশূদ্রদের উপর। গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদানেই এই চন্ডাল (চাঁড়াল) জাতি আজ নমশূদ্র সম্প্রদায় হিসাবে নতুন পরিচয় লাভ করেছে।

শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ‍্য পুত্র মহাত্মা গুরুচাঁদ ঠাকুরকে বর্ণহিন্দুরা স্কুলে ভর্তি হতে দেয় নি। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য তাঁকে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো হয়েছিল। তিনি উচ্চ শিক্ষিত ব‍্যক্তিতে পরিনত হয়ে, গ্রাম বাংলায় ১৮৮২ টি বিদ‍্যালয় স্থাপন করে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে – অনন্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন।

মূলত হিন্দু ধর্মের অনুসারি হলেও ব্রাক্ষন্যবাদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হরিচাঁদ ঠাকুর নমশুদ্র সম্প্রদায়কে নতুন পথ দেখাতে ‘মতুয়া’ আন্দোলনের জন্ম দেন। নমশুদ্র সম্প্রদায়কে আগে চণ্ডাল বলে ডাকা হতো। এসব বিষয়কে বদলাতে তিনি নমশুদ্র সম্প্রদায়কে শিক্ষিত করার উদ্যোগ নেন। এজন্য তিনি স্কুল গড়তে শুরু করেন।

মতূয়াভক্তদের মতে- ২শ’ ৭ বছর আগে ১২১৮ সালের  মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে ব্রহ্মমুহূর্তে মহাবারুণীর দিনে কাশিয়ানী উপজেলার সাফলীডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন পূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুর। পিতা যশোবন্ত ঠাকুরের পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। বাল্যনাম হরি হলেও ভক্তরা হরিচাঁদ নামেই তাকে ডাকতেন। ছোটবেলা থেকেই তার অলৌকিকত্ব ও লীলার জন্য বিখ্যাত হয়ে ওঠে পার্শবর্তী গ্রাম ওড়াকান্দি। ক্রমেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ওড়াকান্দির নাম এবং সারা দেশের হিন্দু-সম্প্রদায়ের কাছে এটি পরিণত হয় তীর্থস্থানে। ৬৬ বছর বয়সে ১২৮৪ বঙ্গাব্দে জন্ম দিবসের একই তিথিতেই তিনি দেহত্যাগ  করেন।

সাধক পুরুষ শ্রী হরিচাদ ঠাকুর মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক ছিলেন। আর্য হিন্দুদের শোষনের বিরুদ্ধে তিনি নিম্নবর্ণের হিন্দুদের সঙ্ঘবদ্ধ করে ধর্মপালনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি সংসার বিবাগী নয়, সংসারী সেজেই ঈশ্বর প্রেমের বানী প্রচার করেছেন,তার বাবা যশমন্ত বৈরাগী মৈথালী ব্রাহ্মন ছিলেন।

হরিচাদ ঠাকুরের জ্যেষ্ঠ পুত্র গুরুচাদ ঠাকুরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল মাদ্রাসায়। পিতার মৃত্যুর পরে তাকেই মতুয়া আন্দোলনের হাল ধরতে হয়। বর্ণহিন্দুদের সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে ১৮৮০সালে ওড়াকান্দিতে তিনি প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। অস্পৃর্শতা দুর করে শিক্ষাকে গণ আন্দোলনে রূপদিতে ৯০বছরের জীবনে ১৮৮২টি স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। যা বাংলাদেশর এই অঞ্চলকে(যশোহর,খুলনা,ফরিদপুর) শিক্ষার আলোয় আলোকিত করে।

  এছাড়াও চন্ডাল জাতিকে নমশূদ্র জাতিতে উত্তরনের নেতৃত্ব দেন তিনি। তার চেষ্টায় ১৯০৭ সালে বাংলা-আসামের গভর্নর জেনারেলের কাছে প্রতিবেদন পেশ করা হয় এবং ১৯১১ সালে চন্ডাল গালি মোচন ও নমশূদ্র সম্প্রদায় হিসাবে তারা চিহ্নিত হয়। তেভাগা আন্দোলনে তার অসামান্য অবদান রয়েছে।

আধ্যাত্মিকর পাশাপাশি রাজনৈতিক,সামাজিক,শিক্ষার আন্দোলনের ভূমিকা তাকে অবিস্মরনীয় করে রেখেছে। কথিত আছে তার দর্শন পেতে এলে তিনি তাকে আগে স্কুল প্রতিষ্ঠা করে আসতে বলতেন। তাকে দলিতদের বিদ্যাসাগর বলা হতো। শিক্ষা -দীক্ষায়  নমশুদ্র শ্রেনীর বর্তমান অবস্থান তারই আন্দোলনের ফসল। তার এই বিপ্লবী কর্মকাণ্ড সমাজের একটি স্তরকে বদলে দিয়েছে।  সে বিবেচনায় প্রতিটি নমশুদ্র পরিবার ঠাকুর বংশের কাছে চিরকৃতজ্ঞ থাকবে।

সাধনা সম্পর্কে মতুয়াদের প্রতি শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ১২ টি উপদেশ আছে, যা ‘দ্বাদশ আজ্ঞা’ নামে পরিচিত। সেগুলি হলো:

১. সদা সত্য কথা বলবে

২. পিতা-মাতাকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি করবে

৩. নারীকে মাতৃজ্ঞান করবে

৪. জগৎকে ভালোবাসবে

৫. সকল ধর্মের প্রতি উদার থাকবে

৬. জাতিভেদ করবে না

৭. হরিমন্দির প্রতিষ্ঠা করবে

৮. প্রত্যহ প্রার্থনা করবে

৯. ঈশ্বরে আত্মদান করবে

১০. বহিরঙ্গে সাধু সাজবে না

১১. ষড়রিপু বশে রাখবে

১২. হাতে কাম ও মুখে নাম করবে।

ট্যাগ ১৮৮০সালে ওড়াকান্দিতে তিনি প্রথম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন৯০বছরের জীবনে ১৮৮২টি স্কুল প্রতিষ্ঠাঅস্পৃশ্য জনগোষ্ঠীর চন্ডালত্ব মোচনঈশ্বরে আত্মদান করবেএমনকি বাড়ির উপর দিয়ে হাটলেও ছিঃ ছিঃ বলে গোবর ছিটাতো। তাঁদের সাথে রাস্তার কুকুরের মত আচরন করত ব্রাক্ষন্যবাদীরাওড়াকান্দিকাশিয়ানী উপজেলার সাফলীডাঙ্গা গ্রামখুলনাগুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদানেই এই চন্ডাল ( চাঁড়াল ) জাতি আজ নমশূদ্র সম্প্রদায় হিসাবে নতুন পরিচয় লাভ করেছে।গুরুচাদ ঠাকুরের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল মাদ্রাসায়চন্ডাল গালি মোচনচন্ডাল জাতিচন্ডাল জাতিকে নমশূদ্র জাতিতে উত্তরনের নেতৃত্ব দেন তিনিচাঁড়ালজগৎকে ভালোবাসবেজাতিভেদ করবে নাতেভাগা আন্দোলনদলিতদের বিদ্যাসাগরনমশূদ্র জাতিনমশূদ্র সম্প্রদায়নারীকে মাতৃজ্ঞান করবেপিতা যশোবন্ত ঠাকুরের পাঁচ পুত্রের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়পিতা-মাতাকে দেবতাজ্ঞানে ভক্তি করবেপুকুরের জল খেতে ও স্নান করতে দিতনাপূর্ণব্রহ্ম হরিচাঁদ ঠাকুরপ্রত্যহ প্রার্থনা করবেফরিদপুরবহিরঙ্গে সাধু সাজবে নাবাংলার বিশাল অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠী সনাতন ধর্ম ছেড়ে অন‍্যধর্মে চলে যেত।ব্রাক্ষন্যবাদের অত্যাচারমতুয়া আন্দোলনমহাত্মা গুরুচাঁদ ঠাকুরযশমন্ত বৈরাগী মৈথালী ব্রাহ্মনযশোহরষড়রিপু বশে রাখবেসকল ধর্মের প্রতি উদার থাকবেসদা সত্য কথা বলবেহরিমন্দির প্রতিষ্ঠা করবেহাতে কাম ও মুখে নাম করবে

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Ovi Pandey
লেখক / প্রতিবেদক

Ovi Pandey

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।