নারীর স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগকে শুধু চিকিৎসাসেবার ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি মানবসম্পদ উন্নয়ন, অর্থনৈতিক অগ্রগতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কল্যাণ নিশ্চিত করার কৌশলগত পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
রোববার (১১ অক্টোবর) জার্মানির বার্লিনে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) আয়োজনে ‘দ্য মোমেন্ট ইজ নাউ: আনলকিং নিউ ক্যাপিটাল ফর উইমেনস হেলথ বিয়ন্ড এইড’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। বার্লিনের ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের হল-২-এ এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়।
অনুষ্ঠানে ডা. জুবাইদা রহমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের নারীর স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা রূপান্তরের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্যকে জাতীয় স্বাস্থ্যব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে রেখে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন।
নারীর স্বাস্থ্য ও ক্ষমতায়নের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশে নারীর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরে ডা. জুবাইদা রহমান শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ভূমিকার কথা স্মরণ করেন।
তিনি বলেন, গ্রামীণ উন্নয়ন, পরিবার পরিকল্পনা, জনগণের অংশগ্রহণ এবং নারীর ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে জিয়াউর রহমান দেশের সামাজিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন। পরবর্তী সময়ে বেগম খালেদা জিয়া নারীশিক্ষা ও ক্ষমতায়ন এগিয়ে নিতে ভূমিকা রাখেন। বিশেষ করে মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের উপবৃত্তিসহ বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে কিশোরীদের শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত হয়।
জুবাইদা রহমান বলেন, এই ধারাবাহিকতা এগিয়ে নিয়ে কিশোরী ও নারীদের স্বাস্থ্যসেবায় নতুন প্রজন্মের উপযোগী বিনিয়োগ বাস্তবায়নে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
জীবনচক্রভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবায় গুরুত্ব
ডা. জুবাইদা রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, নারীর স্বাস্থ্যসেবা বলতে শুধু মাতৃস্বাস্থ্যকে বোঝায় না। কিশোরীদের পুষ্টি, রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধ, যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, মা ও নবজাতকের চিকিৎসা এবং জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসাসহ জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি জানান, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করতে এক লাখ কমিউনিটি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলবিয়িং কর্মী এবং অতিরিক্ত ২৫ হাজার পেশাদার মিডওয়াইফ নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে অনুষ্ঠানে তুলে ধরা হয়।
এসব উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা বাড়ানো, মা ও নবজাতকের চিকিৎসার মান উন্নত করা, নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব উৎসাহিত করা এবং প্রতিরোধযোগ্য মাতৃ ও নবজাতকের মৃত্যু কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
উপজেলা পর্যায়ে সমন্বিত মাতৃস্বাস্থ্যসেবা
জুবাইদা রহমান বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে সমন্বিত মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবার নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রে পরিণত করতে চায় সরকার। সেখানে স্বাভাবিক প্রসবের পাশাপাশি জরুরি প্রসূতি ও নবজাতকের চিকিৎসাসেবাও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্যসেবা পেতে কোনো নারীকে যেন নিজ উপজেলা হাসপাতালের বাইরে যেতে না হয়, সেটিই সরকারের লক্ষ্য। তবে জটিল রোগীর ক্ষেত্রে বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য কার্যকর রেফারেল ব্যবস্থা থাকতে হবে।
তাঁর মতে, স্থানীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা কেবল অবকাঠামো উন্নয়নের বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্যসেবায় সমতা, মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও যুক্ত।
নারীর স্বাস্থ্য খাতে ২৫ কোটি ইউরোর অর্থায়ন
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের সঙ্গে ২৫ কোটি ইউরোর রেয়াতি ঋণ অর্থায়ন চুক্তির কথা তুলে ধরেন ডা. জুবাইদা রহমান।
এ ছাড়া ইউএনএফপিএ অতিরিক্ত ২ কোটি ৫০ লাখ ইউরো অনুদান সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে বলে জানানো হয়।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইউএনএফপিএর চিফ অব স্টাফ ড. নিগিনা মুনতিয়ান। মূল বক্তব্য দেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল ও ইউএনএফপিএর নির্বাহী পরিচালক ড. দিয়েন কেইতা।
উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ড. এস. এম. জিয়াউদ্দিন হায়দার, জার্মানির ফেডারেল অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের পার্লামেন্টারি স্টেট সেক্রেটারি ড. বারবেল কফলার, ঘানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী কোয়াবেনা মিন্টাহ আকানদোহ এবং ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট মারেক মোরা। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনও উপস্থিত ছিলেন।





