তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু
তিস্তা মহাপরিকল্পনা

উত্তরাঞ্চলের দীর্ঘদিনের বন্যা, নদীভাঙন ও শুষ্ক মৌসুমে পানিসংকট মোকাবিলায় আলোচিত তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সরকারের কার্যক্রম এগোচ্ছে। মহাপরিকল্পনার বিভিন্ন অবকাঠামোগত কাজ শুরুর আগে কারিগরি ও অর্থনৈতিক দিক যাচাইসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সরকারের পক্ষ থেকে জাতীয় সংসদে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারের কথা জানানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও তিস্তা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণের জন্য নতুন ব্যারেজ নির্মাণের কারিগরি ও আর্থিক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের (বাপাউবো) সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার আওতায় ১১০ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ বা নদীশাসন, ১১০ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং, ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন বা স্পার নির্মাণ ও মেরামত এবং প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।

নদীশাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব

প্রস্তাবিত মহাপরিকল্পনার অন্যতম লক্ষ্য তিস্তা নদীর গতিপথ ও তীর সংরক্ষণ, নাব্যতা বজায় রাখা এবং বন্যা ও নদীভাঙনের ক্ষতি কমানো। এ জন্য নদী ড্রেজিংয়ের পাশাপাশি দীর্ঘ বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ এবং বাঁধের ওপর সড়ক তৈরির পরিকল্পনা রাখা হয়েছে।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা অববাহিকার রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলায় ইতোমধ্যে নদীতীর সংরক্ষণের বিভিন্ন কাজ হয়েছে। ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব এলাকায় ২২২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪২ দশমিক ১৭ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণকাজ সম্পন্ন হওয়ার তথ্য সংসদে জানানো হয়েছে।

পুনরুদ্ধার হতে পারে ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি

মহাপরিকল্পনার আওতায় নদীশাসনের মাধ্যমে প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের প্রস্তাব রয়েছে। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে পুনরুদ্ধার করা ভূমি কৃষি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এ ছাড়া শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও সেচ সুবিধা বাড়ানোর মাধ্যমে কৃষি উৎপাদন এবং ফসলের বহুমুখীকরণের সুযোগ বাড়ানোর লক্ষ্যও রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগেও প্রভাব পড়তে পারে

প্রস্তাবিত ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর সড়ক নির্মাণ করা হলে নদীবেষ্টিত ও বন্যাপ্রবণ এলাকার যোগাযোগব্যবস্থায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে। একই অবকাঠামো বন্যা প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থানীয় যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তিস্তা নদীকেন্দ্রিক এই সমন্বিত পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন মোকাবিলা, পানি সংরক্ষণ, সেচ, নদীশাসন এবং ভূমি উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

চীনের সহযোগিতার বিষয়ও আলোচনায়

সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে চীনের কারিগরি সহযোগিতা ও সমর্থনের বিষয়টি রয়েছে। পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, তিস্তা নদীর স্থায়ী সমাধান ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক রূপান্তর সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার।

তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো পরীক্ষা-নিরীক্ষার ধাপ অতিক্রম করতে হবে। প্রধানমন্ত্রীও সংসদে জানিয়েছেন, পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে কারিগরি দিক ইতিবাচক হলে বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হবে।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে উত্তরাঞ্চলের নদীভাঙন ও বন্যার ক্ষতি কমানো, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং নদীঘেঁষা ভূমির অর্থনৈতিক ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে প্রকল্পটির প্রকৃত সুফল নির্ভর করবে কারিগরি নকশা, অর্থায়ন, নদীর পানিপ্রবাহ, পরিবেশগত প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনার ওপর।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
সংবাদ প্রতিনিধি

দ্য নিউজ ডেস্ক

এই সংবাদটি The News-এর সংবাদ প্রতিনিধি পাঠিয়েছেন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।