শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি আজ

শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি আজ
লোকনাথ বাবার আবির্ভাব

আজ ৪ সেপ্টেম্বর, শুক্রবার। ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের এই দিনে কৃষ্ণাষ্টমী তিথিতে স্মরণ করা হচ্ছে ত্রিকালদর্শী মহাযোগী, ব্রাহ্মজ্ঞ ও মহাপুরুষ শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবাকে। ভক্তদের কাছে দিনটি লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি হিসেবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এ উপলক্ষে বিভিন্ন মন্দির ও আশ্রমে ধর্মীয় আয়োজন, পূজা, প্রার্থনা ও ভক্তদের সমাগমের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।

লোকনাথ বাবার জন্মস্থান হিসেবে বর্তমান ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট-স্বরূপনগর এলাকার কাছাকাছি চাকলা-কাঁকড়া গ্রামের কথা উল্লেখ করা হয়। প্রচলিত জীবনী অনুসারে, জন্মাষ্টমীর দিনে ঘোষাল পরিবারে তাঁর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ছিলেন রামকানাই ঘোষাল এবং মাতা কমলাদেবী।

ব্রহ্মচর্যের সংকল্প থেকেই ‘লোকনাথ’

প্রচলিত জীবনী অনুযায়ী, রামকানাই ঘোষালের ইচ্ছা ছিল তাঁর সন্তানদের একজনকে নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচারী হিসেবে গড়ে তোলা। প্রথম তিন সন্তানের ক্ষেত্রে সেই ইচ্ছা পূরণ না হলেও চতুর্থ সন্তান জন্মের পর কমলাদেবী নিজেই নবজাতককে ব্রহ্মচর্যের পথে উৎসর্গ করার সম্মতি দেন।

এতে রামকানাই ঘোষাল অত্যন্ত আনন্দিত হন এবং তৎকালীন পণ্ডিত ভগবান গাঙ্গুলির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভগবান গাঙ্গুলি শিশুটির মধ্যে অসাধারণ আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা দেখতে পান বলে লোকনাথের জীবনীতে বর্ণনা পাওয়া যায়। পরে তাঁর নাম রাখা হয় ‘লোকনাথ’।

আরও পড়ুনঃ আজ ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার পঞ্জিকা ও ইতিহাসের এইদিনে

শৈশব থেকেই তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা ও শাস্ত্রচর্চার প্রতি গুরুজনদের বিশেষ মনোযোগ ছিল। তবে লোকনাথ বাবার নিজের স্মৃতিচারণে তাঁর শৈশবের দুষ্টুমি ও খেলাধুলার কথাও উঠে এসেছে। গুরুজনেরা তাঁকে ধর্ম ও জ্ঞানের কথা বোঝানোর চেষ্টা করলেও সমবয়সী শিশুদের সঙ্গে খেলাধুলায়ও তিনি ছিলেন সমান আগ্রহী।

১১ বছর বয়সেই উপনয়ন ও সন্ন্যাসের প্রস্তুতি

প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, প্রায় ১১ বছর বয়সে লোকনাথের উপনয়ন ও সন্ন্যাস গ্রহণের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। একই সময়ে তাঁর শৈশবের সঙ্গী বেণীমাধব বন্দ্যোপাধ্যায়েরও উপনয়ন নির্ধারিত ছিল।

বেণীমাধবও লোকনাথের সঙ্গে সন্ন্যাস গ্রহণের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে সন্ন্যাসজীবনের কঠোরতা, অরণ্যবাসের কষ্টসহ নানা বিষয় বোঝানোর চেষ্টা করা হলেও তাঁর সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়নি।

এরপর ভগবান গাঙ্গুলির তত্ত্বাবধানে লোকনাথ ও বেণীমাধবের আধ্যাত্মিক শিক্ষার সূচনা হয়। তাঁদের জীবন ধীরে ধীরে গৃহজীবনের গণ্ডি ছাড়িয়ে সাধনা ও ত্যাগের পথে এগিয়ে যায়।

কালীঘাটে সাধনজীবনের সূচনা

লোকনাথ বাবার জীবনীতে বলা হয়, ভগবান গাঙ্গুলি দুই শিষ্যকে নিয়ে সাধনার উপযুক্ত স্থান খুঁজতে বের হন। একপর্যায়ে তাঁরা কালীঘাটে পৌঁছান। তখনকার কালীঘাট ছিল সাধু-সন্ন্যাসীদের সাধনাস্থল হিসেবে পরিচিত।

শৈশবের চঞ্চলতা তখনও পুরোপুরি কাটেনি। কালীঘাটে অবস্থানকালে লোকনাথ ও বেণীমাধব বিভিন্ন সাধু-সন্ন্যাসীর সঙ্গে শিশুসুলভ দুষ্টুমি করতেন বলে তাঁর জীবনীতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁদের এই আচরণে সাধুরা বিরক্ত হলেও ভগবান গাঙ্গুলি তাঁদের আধ্যাত্মিক শিক্ষার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি সাধুদের ওপরই ছেড়ে দেন।

আরও পড়ুনঃ আজ ৪ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাশিফল ও গ্রহদোষ প্রতিকারের উপায়

পরবর্তী সময়ে লোকনাথ কঠোর ব্রহ্মচর্য, যোগসাধনা, আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের পথে এগিয়ে যান। দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়ে তিনি একজন সাধক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

জন্মভূমি থেকে বেরিয়ে দীর্ঘ সাধনার পথে

সন্ন্যাসজীবনে প্রবেশের পর লোকনাথ বাবা ও তাঁর গুরু ভগবান গাঙ্গুলি একপর্যায়ে শেষবারের মতো জন্মভূমি কচুয়া গ্রামে ফিরে আসেন। এরপর তিনি সংসারজীবনের মোহ ত্যাগ করে দীর্ঘ সাধনা ও পরিব্রাজকের জীবনে প্রবেশ করেন।

ভক্তদের বিশ্বাস, কঠোর তপস্যা, যোগসাধনা ও মানবকল্যাণের মাধ্যমে লোকনাথ বাবা পরবর্তীকালে একজন মহান আধ্যাত্মিক পুরুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য ভক্তের বিশ্বাস, প্রার্থনা ও আধ্যাত্মিক অনুভূতি।

চাকলায় আবির্ভাব তিথিতে ভক্তদের ঢল

লোকনাথ বাবার জন্মস্থান চাকলায় তাঁর স্মরণে প্রতিবছর বিশেষ ধর্মীয় আয়োজন হয়ে থাকে। উত্তর ২৪ পরগনার দেগঙ্গা এলাকার চাকলা শ্রীশ্রী লোকনাথ মন্দিরে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়।

অনেক ভক্ত দূরদূরান্ত থেকে পবিত্র জল সংগ্রহ করে পায়ে হেঁটে চাকলা মন্দিরে পৌঁছান। যশোর রোড, বেড়াচাঁপা-টাকি রোডসহ বিভিন্ন সড়ক ও নৌপথ ব্যবহার করে ভক্তরা মন্দিরে আসেন। তাঁদের বিশ্বাস, বাবার মন্দিরে পবিত্র জল দিয়ে পূজা ও প্রার্থনা করলে মনোবাঞ্ছা পূর্ণ হয়।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের বারদী লোকনাথ আশ্রম এবং রাজধানীর স্বামীবাগের শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দিরে আজ ভক্তদের ব্যাপক সমাগম হয়েছে। শ্রীশ্রী লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে সকাল থেকেই পূজা, প্রার্থনা, নামসংকীর্তন ও বিভিন্ন ধর্মীয় আয়োজনে মুখর হয়ে ওঠে দুই মন্দির প্রাঙ্গণ।

আরও পড়ুনঃ শুভ জন্মাষ্টমী আজ: সত্য-ন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বার্তা

সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ভক্তরা বারদী আশ্রমে আসতে শুরু করেন। বাবার মন্দিরে পূজা ও প্রার্থনার পাশাপাশি ভক্তরা তাঁর চরণে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন এবং নিজেদের ও পরিবারের মঙ্গল কামনায় প্রার্থনা করেন। বারদী আশ্রমে এর আগেও লোকনাথ বাবার বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবে দেশ-বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ভক্তের সমাগম হয়েছে এবং নিরাপত্তায় পুলিশ, সিসিটিভি ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকার স্বামীবাগের শ্রীশ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী আশ্রম ও মন্দিরেও ভক্তদের উপস্থিতিতে উৎসবমুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। মন্দিরটির নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে এখানে বিশেষ ধর্মীয় কর্মসূচি পালনের ঐতিহ্য রয়েছে।

লোকনাথ বাবার জীবন ও সাধনার সঙ্গে বারদী আশ্রমের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ সরকারের ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকাশনাতেও বারদী লোকনাথ মন্দির ও ঢাকার স্বামীবাগ মন্দিরকে তাঁর আদর্শ ও স্মৃতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উল্লেখযোগ্য স্থান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

আবির্ভাব দিবস উপলক্ষে ভক্তরা উপবাস, পূজা, নামসংকীর্তন ও প্রার্থনায় অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই দূর-দূরান্ত থেকে এসে মন্দিরে কিছু সময় অবস্থান করে বাবার আশীর্বাদ কামনা করছেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, লোকনাথ বাবা ছিলেন ত্যাগ, সাধনা, মানবসেবা ও আধ্যাত্মিকতার প্রতীক।

দিনভর দুই মন্দিরেই ভক্তদের আনাগোনা অব্যাহত থাকবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও ভক্তদের প্রার্থনায় আবির্ভাব দিবসটি পালিত হচ্ছে।

নিরাপত্তায় বিশেষ ব্যবস্থা

ভক্তদের বিপুল সমাগমকে কেন্দ্র করে স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মন্দিরে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে নজরদারি, সিসিটিভি ক্যামেরা, মেটাল ডিটেক্টর, পর্যাপ্ত পুলিশ মোতায়েন, পানীয় জলের ব্যবস্থা, মেডিকেল টিম ও অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখার মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ভক্তদের নির্বিঘ্নে যাতায়াত নিশ্চিত করতে যানবাহন নিয়ন্ত্রণ ও পার্কিং ব্যবস্থার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। উৎসবকে ঘিরে যশোর রোড ও টাকি রোডে যানজট নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বাড়তি দায়িত্ব পালন করতে হয়।

লোকনাথ বাবার আবির্ভাব তিথিকে ঘিরে আজও দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ভক্তদের কাছে লোকনাথ বাবা শুধু একজন সাধক নন; তিনি বিশ্বাস, আধ্যাত্মিকতা, ত্যাগ ও মানবকল্যাণের এক অনন্য প্রতীক।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।