২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম। তিনি বলেছেন, নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে চালকদের প্রশিক্ষণ, যানবাহনের ফিটনেস নিশ্চিত করা, অনিয়ন্ত্রিত গতি নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয় সড়ক ভবনের অডিটোরিয়ামে ‘সড়ক দুর্ঘটনা পরবর্তী জরুরি চিকিৎসা সেবায় ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স, ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স ও ৮০টি প্যাট্রোল মোটরসাইকেল সার্ভিস’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘বাংলাদেশ সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্প’ (বিআরএসপি)-এর আওতায় এসব অ্যাম্বুলেন্স ও প্যাট্রোল মোটরসাইকেল চালু করা হয়। দেশের প্রথম বহুখাতভিত্তিক এবং সেইফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ-ভিত্তিক এ প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, বিআরটিএ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
শেখ রবিউল আলম বলেন, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাচ্ছেন। প্রতিদিনই অসংখ্য মানুষ সড়কে প্রাণ দিচ্ছেন। এই পরিস্থিতি পরিবর্তন করতে সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্য অর্জনে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অদক্ষ চালক। অনেক চালক পরিবহনে কাজ করতে করতে ধীরে ধীরে গাড়ি চালানো শিখেছেন। কিন্তু মহাসড়কে কীভাবে নিয়ম মেনে গাড়ি চালাতে হয়, সে বিষয়ে তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই। এ জন্য চালকদের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতাও যাচাই করা প্রয়োজন।
জনসচেতনতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মন্ত্রী বলেন, মহাসড়কের পাশে বাজার, স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন স্থানে মানুষ অনেক সময় নিয়ম না মেনে রাস্তা পার হন। কোথাও ওভারপাস বা নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা থাকলেও অনেকে তা ব্যবহার করেন না। ফলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনিয়ন্ত্রিত গতি এবং হেলমেট ব্যবহার না করার প্রবণতাও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এসব বিষয়ে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরে শেখ রবিউল আলম বলেন, বাসের আয়ুষ্কাল ২০ বছর এবং ট্রাকের আয়ুষ্কাল ২৫ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। পুরোনো যানবাহন স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিংয়ের জন্য নীতিমালা চূড়ান্ত করা হয়েছে। ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের মাধ্যমে ফিটনেসবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন স্ক্র্যাপ ও রিসাইক্লিংয়ের আওতায় আনা হবে।
অনুষ্ঠানে চালু হওয়া জরুরি সেবার বিষয়ে বলা হয়, বিআরএসপি-এর আওতায় জয়দেবপুর-হাটিকুমরুল-বগুড়া-রংপুর, হাটিকুমরুল-নাটোর-রাজশাহী এবং জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ জাতীয় মহাসড়কের মোট ৫০০ কিলোমিটার অংশে ৬০টি বেসিক লাইফ সাপোর্ট অ্যাম্বুলেন্স মোতায়েন থাকবে। প্রতি ১০ কিলোমিটার এলাকায় একটি করে অ্যাম্বুলেন্স রাখা হবে, যাতে দুর্ঘটনার পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দেওয়া যায়।
এছাড়া, রাজধানী ঢাকায় দুর্ঘটনা-পরবর্তী জরুরি সেবার জন্য ৪০টি মোটরসাইকেল অ্যাম্বুলেন্স এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশের আওতায় ৮০টি প্যাট্রোল মোটরসাইকেল নিয়োজিত থাকবে।
এসব উদ্যোগের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, দুর্ঘটনার পর দ্রুততম সময়ে আহত ব্যক্তির কাছে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে পৌঁছানো সম্ভব হলে অনেক প্রাণ বাঁচানো সম্ভব। এ জন্য বাইক অ্যাম্বুলেন্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। একই সঙ্গে মহাসড়কের পাশে থাকা হাসপাতালগুলোতে আলাদা ইউনিট রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে মহাসড়কের পাশে থাকা হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখতে হবে। পাশাপাশি যেসব ট্রমা সেন্টার বর্তমানে অকার্যকর হয়ে আছে, সেগুলোও সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সড়ক নিরাপত্তায় তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত ভূমিকার কথা উল্লেখ করে শেখ রবিউল আলম বলেন, সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয় সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও যানবাহনের অনুমোদনের দায়িত্ব পালন করছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন হাইওয়ে পুলিশ সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যবস্থাপনা ও আইন প্রয়োগ করছে। আর দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় এই তিন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিতভাবে কাজ করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, একটি সমন্বিত নিরাপদ সড়ক আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এ আইন প্রণয়ন করা হবে। পাশাপাশি সড়ক নিরাপত্তা প্রকল্পের অর্থ যেন যথাযথভাবে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠায় ব্যয় হয়, সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

মন্ত্রী বলেন, শুধু সড়কে মার্কিং, অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা আইন করলেই দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। জনগণকে সড়ক ব্যবহারের নিয়ম সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। একই সঙ্গে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য সড়ক দুর্ঘটনা কমানো এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত জরুরি সেবা নিশ্চিত করা। জনগণের অর্থ ও বৈদেশিক সহায়তায় পরিচালিত প্রকল্পের শতভাগ সুফল জনগণকে দিতে হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ এমপি, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত এমপি এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের প্রধান সমন্বয়ক মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাস এমপি।
এ সময় আরও উপস্থিত ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ ও ভুটান ডিভিশনের ডিরেক্টর জিন পেসমে, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামানসহ সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ পুলিশ, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।





