আকাশযুদ্ধের ভবিষ্যৎ বদলে যাচ্ছে দ্রুত। আগামী দিনের যুদ্ধবিমান শুধু একজন পাইলটের নিয়ন্ত্রণে আকাশে উড়বে না; বরং চালকবিহীন ড্রোন, উন্নত সেন্সর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নিরাপদ ডিজিটাল যোগাযোগব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত হয়ে কাজ করবে। যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ‘কমব্যাট ক্লাউড’ প্রযুক্তি।
এই পরিবর্তনের মধ্যেই ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির ক্ষেত্রে ফ্রান্সের সঙ্গে সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে ভারত। বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে ভারতের জন্য এটি শুধু নতুন একটি অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান সংগ্রহের সুযোগ নয়, বরং ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান প্রযুক্তির উন্নয়ন ও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার পথও খুলে দিতে পারে।
ইউরোপের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে পরিবর্তন
ইউরোপে ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান তৈরির অন্যতম বড় উদ্যোগ ছিল ফ্রান্স, জার্মানি ও স্পেনের Future Combat Air System বা FCAS। এই ব্যবস্থার মূল ধারণায় ছিল একটি নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমানকে চালকবিহীন ‘রিমোট ক্যারিয়ার’, সেন্সর এবং নিরাপদ ‘কমব্যাট ক্লাউড’-এর সঙ্গে যুক্ত করা।
তবে প্রকল্পটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—নতুন প্রজন্মের যুদ্ধবিমান তৈরির বিষয়ে ফ্রান্সের Dassault Aviation এবং ইউরোপীয় শিল্পগোষ্ঠী Airbus-এর মধ্যে নেতৃত্ব, কাজের বণ্টন ও প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। শেষ পর্যন্ত ৮ জুন ২০২৬ ফ্রান্স ও জার্মানি যৌথ যুদ্ধবিমান তৈরির পরিকল্পনা থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
তবে এর অর্থ FCAS-এর প্রতিটি উপাদান বন্ধ হয়ে যাওয়া নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে বিভিন্ন বিমান, ড্রোন ও অস্ত্রব্যবস্থাকে সংযুক্ত করার ‘Combat Cloud’সহ কিছু প্রযুক্তিগত সহযোগিতা অব্যাহত রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
ভারতের জন্য কেন তৈরি হয়েছে সুযোগ?
FCAS-এর মূল যুদ্ধবিমান কর্মসূচি নিয়ে ইউরোপীয় অংশীদারদের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হওয়ার পর ফ্রান্সের সামনে নতুন সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ভারত ইতোমধ্যেই ফ্রান্সের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও বিমান প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ দেখিয়েছে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতেই ভারতের সঙ্গে ফ্রান্সের ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্ভাব্য সহ-উন্নয়ন ও সহ-উৎপাদন নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছিল।
জুনেও ভারত-ফ্রান্সের মধ্যে ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমান নিয়ে সহযোগিতার সম্ভাবনা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ফলে দিল্লির সামনে এখন প্রশ্ন—শুধু বিদেশি প্রযুক্তির যুদ্ধবিমান কেনা, নাকি উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হওয়া?
শুধু ক্রেতা নয়, প্রযুক্তির অংশীদার হওয়ার লক্ষ্য
ভারতের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দেশীয় ব্যবস্থার সঙ্গে নতুন যুদ্ধবিমানকে সমন্বয় করার সক্ষমতা।
ভারতীয় ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা কিংবা নিজস্ব সেন্সর ভবিষ্যৎ যুদ্ধবিমানে যুক্ত করতে হলে নির্মাতা দেশের কাছ থেকে নির্দিষ্ট মাত্রার প্রযুক্তিগত সহযোগিতা প্রয়োজন হবে।
এখানেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত যুদ্ধবিমানের সফটওয়্যার, মিশন সিস্টেম, সেন্সর ফিউশন ও অস্ত্র-ইন্টিগ্রেশন প্রযুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ সাধারণত অত্যন্ত সংবেদনশীল হিসেবে বিবেচিত হয়। তাই ভারত কতটা প্রযুক্তিগত প্রবেশাধিকার পাবে, সেটিই সম্ভাব্য চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে।
চীনের অগ্রগতিও ভারতের জন্য চাপ বাড়াচ্ছে
ভারতের কৌশলগত উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ চীনের বিমানশক্তির দ্রুত আধুনিকায়ন। চীন ইতোমধ্যে J-20-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের স্টেলথ যুদ্ধবিমান পরিচালনা করছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিমান প্রযুক্তি নিয়েও কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।
অন্যদিকে ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমান বহরে পুরোনো প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত করার চাপ বাড়ছে। ফলে ষষ্ঠ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান প্রকল্পে অংশগ্রহণ ভারতের দীর্ঘমেয়াদি বিমান প্রতিরক্ষা কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে।
ভারতের সামনে কঠিন সিদ্ধান্ত
ফ্রান্সের সঙ্গে সম্ভাব্য সহযোগিতা সফল হলে ভারত একদিকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত হতে পারে, অন্যদিকে দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্যও নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে শুধু অর্থ বিনিয়োগ করলেই প্রযুক্তির পূর্ণ অধিকার পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। উন্নয়ন ব্যয়, মেধাস্বত্ব, প্রযুক্তি ব্যবহারের অধিকার, উৎপাদন ক্ষমতা, রপ্তানি নীতি এবং ভারতীয় অস্ত্র ও সেন্সর সংযুক্তির অনুমতি—সবকিছুই আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।
ফলে ভারতের জন্য মূল প্রশ্নটি এখন আর শুধু ‘কোন যুদ্ধবিমান কিনবে’—এটি নয়। বরং প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতের যুদ্ধবিমান তৈরির প্রযুক্তিগত যাত্রায় ভারত কি অংশীদার হতে পারবে?
ফ্রান্স যদি ভারতকে শুধু ক্রেতা হিসেবে না দেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত অংশীদার হিসেবে গ্রহণ করে, তাহলে এই সহযোগিতা ভারতীয় প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি বড় পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। আর যদি প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ ও মেধাস্বত্বের প্রশ্নে বড় সীমাবদ্ধতা থাকে, তাহলে বিপুল বিনিয়োগের বিনিময়ে ভারতের প্রত্যাশিত ‘আত্মনির্ভরতা’ কতটা অর্জিত হবে—সেটিই হয়ে উঠবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।



