মালদ্বীপ থেকে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য পরিণতি

মালদ্বীপ থেকে ভারতের সেনা প্রত্যাহারের ভূরাজনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য পরিণতি

ইন্ডিয়া শেষ পর্যন্ত মালদ্বীপ থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করে নিতে শুরু করেছে। ২০১৮ সালে মালদ্বীপ সর্বপ্রথম ভারতকে সৈন্য ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। ফলশ্রুতিতে মালদ্বীপের তৎকালীন সরকারের পতন হয়েছিল। পরবর্তী সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

সম্প্রতি চীন ও মালদ্বীপের মধ্যে প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এছাড়াও মালদ্বীপ ঘোষণা দিয়েছে, তারা চিকিৎসার জন্য ভারত নির্ভরতা কমাবে। শুধু তা-ই নয়, মালদ্বীপ খাদ্য ও ঔষধ পর্যন্ত কিনবে না ইন্ডিয়ার কাছ থেকে। ভারতের বিকল্প হিসেবে থাইল্যান্ড, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইউরোপ ও আমেরিকাকে বেছে নিয়েছে মালদ্বীপ।

২০১০ সালে ইন্ডিয়া যখন মালদ্বীপে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছিল, তখন বিশ্ব কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। কারণ, ভিন্ন রাষ্ট্রে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারা, যে কোন রাষ্ট্রের জন্যই বিরাট গৌরবের ব্যাপার। এবং সেটা সেই রাষ্ট্রের শৌর্য বীর্য ও প্রভাব প্রতিপত্তির পরিচয় বহন করে।

মালদ্বীপ দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষুদ্র দেশ তো বটেই, পৃথিবীর অন্যতম ক্ষুদ্র রাষ্ট্র। অপরদিকে ইন্ডিয়া জনসংখ্যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশ। সেই পুঁচকে মালদ্বীপ ইন্ডিয়াকে সৈন্য ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করে যে অপমান করলো, সেই অপমান কী ইন্ডিয়া নীরবে হজম করবে? বিশ্ব মিডিয়ায় এই প্রশ্ন নিয়ে ঝড় উঠেছে।

আন্তর্জাতিক স্তরে প্রচার চলছে : চীনপন্থী মোহামেদ মুইজ্জু ‘ইন্ডিয়া আউট’ স্লোগান দিয়ে ক্ষমতায় এসে – ভারতকে সৈন্য ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করলো।

আমার ব্যক্তিগত ধারণা, ইন্ডিয়ান সৈন্য বের করে দেওয়ার ক্ষমতা মালদ্বীপের নেই। এটা চীন বের করেছে। ইন্ডিয়া যদি সৈন্য সরিয়ে না নিতো, তাহলে চীন হয়তো জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে প্রস্তাব আনতো। কিন্তু ইন্ডিয়ার যদি ভেটো পাওয়ার থাকতো, তাহলে সৈন্য ফিরিয়ে আনার প্রশ্নই উঠত না।

কেবল মালদ্বীপ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমার সহ প্রতিটি দেশেই চীন ও ভারতের মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই চলছে। ভারতের তুলনায় চীনের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বেশি, সামরিক শক্তি বেশি, কূটনৈতিক প্রভাব বেশি। সঙ্গত কারণেই চীন এগিয়ে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। যেমন মালদ্বীপে ভারতের বিনিয়োগ যেখানে ১৫০ বিলিয়ন ডলার, সেখানে চীনের বিনিয়োগ ১৫০০ বিলিয়ন ডলার। আবার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সবচেয়ে বড় অর্থনীতি ইন্দোনেশিয়ায় বুলেট ট্রেন স্থাপন করে ফেলেছে চীন; অথচ ইন্দোনেশিয়ায় এখন পর্যন্ত ঢুকতেই পারেনি ইন্ডিয়া।

বাস্তবতা হচ্ছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের একচ্ছত্র প্রভাব ঠেকানো দরকার। ইন্ডিয়া একা চীনকে ঠকাতে পারবেনা। যদিও ইন্ডিয়ার পাশে এসে দাঁড়িয়েছে জাপান ও ফ্রান্সের মতো মাঝারি মানের বিশ্বশক্তি। কিন্তু সেটা যথেষ্ট নয়। চীন সমর্থন পাচ্ছে রাশিয়ার, সমর্থন পাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের।

চীনের একচেটিয়া প্রভাব মোকাবিলায়- ভারতের পাশে এসে দাঁড়ানো উচিত ছিল আমেরিকার। দক্ষিণ এশিয়া থেকে আমেরিকার এভাবে হাত গুটিয়ে চলে যাওয়া উচিত হয়নি। আমেরিকার এই অদূরদর্শীতায় সমগ্র দক্ষিণ এশিয়া পরিণত হতে চলেছে চীনের নব‍্য-কলোনিতে। যেমনটা ঘটেছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায়।

কিছুদিন আগে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কাছে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর বলেছেন, “দক্ষিণ এশিয়া ছেড়ে আমেরিকার চলে যাওয়া সত্যি দুর্ভাগ্যজনক ও হতাশাজনক।”

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Dutta
লেখক / প্রতিবেদক

Dutta

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।