ব্রাসিলিয়াস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনা ও প্রাণবন্ত পরিবেশে দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১০১-তম জন্মবার্ষিকী এবং জাতীয় শিশু দিবস উদযাপন করে। দূতাবাসের এ অনুষ্ঠানে আগের বছরগুলোর মত এবারেও শিশু-কিশোররা স্বতস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহন করে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ বিশাল পরিসরে উদযাপনের সকল প্রস্তুতি দূতাবাস সম্পন্ন করলেও ব্রাজিলে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ব্যাপক অবনতির প্রেক্ষিতে সেগুলো স্থগিত করা হয়। ব্রাজিলের একটি স্থানীয় স্কুল এবং একটি আন্তর্জাতিক স্কুলে জাকজমকপূর্ণ পরিবেশে মুজিব বর্ষে বঙ্গবন্ধুর ১০১তম জন্মশতবার্ষিকী আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। ২৮ ফেব্রুয়ারী মধ্যরাত থেকে ব্রাসিলিয়াসহ ব্রাজিলের সকল বড় শহরে লক-ডাউন এবং নৈশকালীন কার্ফ্যিউ চলছে। সকল প্রকার জনসমাবেশও নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ১৬ মার্চ তারিখে ব্রাজিলে ২৭৯৮ জন এ ভাইরাসে মৃত্যুবরণ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সীমিত পরিসরে কিন্তু আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী উৎসব উদযাপন করা হয়।
১৬ই মার্চ বিকেল পাঁচটায় দূতাবাস প্রাঙ্গনে শুরু হওয়া মূল অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বে বাংলাদেশী শিশুরা বাংলাদেশ এবং বঙ্গবন্ধুর উপর চিত্রাংকন করে। এছাড়া শিশু- কিশোররা বঙ্গবন্ধুর উপর আয়োজিত রচনা প্রতিযোগিতাতেও অংশ নেয়। অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সামিয়া ইসরাত রনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত শিশু কিশোরদের সাথে নিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পন করেন। পবিত্র কুরআন থেকে তেলওয়াতের পর বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধের সকল শহীদ, ১৫ আগষ্টে নির্মম হত্যাকান্ডে নিহত বঙ্গবন্ধু পরিবারের সকল শহীদ, মহান ভাষা আন্দোলন সহ গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী সকলের আত্মার মাগফেরাত এবং বাংলাদেশের ক্রমঅগ্রসরমান আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের অব্যাহত অগ্রযাত্রা কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মাননীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং মাননীয় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী প্রদত্ত বাণী পাঠ করা হয়। এরপর বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্মিত একাধিক আলেখ্যচিত্র প্রদর্শিত হয়। উপস্থিত সুধীবৃন্দ প্রদর্শিত ভিডিও চিত্রগুলো মুগ্ধতার সাথে উপভোগ করেন।
দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে অনুষ্ঠিত আলোচনা পর্বে দূতাবাসের কর্মকর্তাগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করেন। বক্তারা মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ উপহার দেবার জন্য বঙ্গবন্ধুকে কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করেন। বক্তারা বঙ্গবন্ধুর জীবনের বিভিন্ন ঘটনার উল্লেখ করে স্বাধীনতা অর্জনে তাঁর অবিস্মরনীয় অবদানের উপর আলোকপাত করেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিতে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা সম্ভব বলে তাঁরা মত প্রকাশ করেন। আলোচনা সভায় অন্যতম প্রধান আলোচক হিসেবে দূতাবাসের সামরিক উপদেষ্টা বঙ্গবন্ধুর জীবন, আমাদের জীবনে তাঁর অবদান এবং শিশু-কিশোরদের নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মমত্ববোধ নিয়ে আলোচনা করেন। সকল শিশু-কিশোরদের তিনি সু-শিক্ষা এবং স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভিবিষ্যতে দেশ সেবায় নিজেদের নিয়জিত করারও আহ্বান জানান।
শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সামিয়া ইসরাত রনি তাঁর সমাপনী বক্তব্যে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কর্মময় জীবন এবং আমাদের স্বাধিকার আন্দোলনে তাঁর ত্যাগ-তিতিক্ষা এবং অপরিমেয় অবদান গভীর শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে উল্লেখ করে ১৯৪৭ সাল থেকে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পটভূমি বিশ্লেষণ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি আরো বলেন যে, ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই আমাদের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছিল। তিনি বলেন যে, বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ সমার্থক। বঙ্গবন্ধু আজ ১৭ কোটি বাঙালির গর্ব। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বিজড়িত একুশে ফেব্রুয়ারি আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাঁর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজ সমগ্র মানবজাতির সম্পদ। আজ জাতিসংঘের মাধ্যমে তাঁর জন্মশতবার্ষিকী পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। এসবই বাঙালি জাতির জন্য গর্বের বিষয়। এ প্রেক্ষাপটে জাতীয় পর্যায়ে বঙ্গবন্ধুর বিষয়ে ঐক্যমত প্ৰতিষ্ঠা ও দেশগঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি সকলকে আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় নেতৃত্বের কথা শ্রদ্ধাভরে উল্লেখ করে তিনি সকলকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার লক্ষ্যে কাজ করে যাওয়ার আহবান জানান। পৃথিবীজুড়ে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকী ও মুজিববর্ষ উদযাপনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিকগণ, বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর উপর সরকার কর্তৃক প্রকাশিত সকল প্রকাশনা ব্রাজিলীয় পর্তুগীজ সাব-টাইটেল (উপশীর্ষক) সংযোজনের ঘোষণা দেন। উল্লেখ্য, অনুষ্ঠানে ব্রাজিলীয় পর্তুগীজ সাব-টাইটেল সযোজিত বঙ্গবন্ধুর উপর নির্মিত ‘আমাদের বঙ্গবন্ধু’-তথ্যচিত্রটি প্রচারিত হয়। আলেখ্যচিত্রে ব্রাজিলীয় পর্তুগীজ ভাষায় সাব-টাইটেল (উপ-শীর্ষক) সংযোজনের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে ব্রাজিলের পর্তুগীজ ভাষাভাষী জনগোষ্ঠির নিকট পরিচিত করে তোলার প্রয়াস সহজতর হবে বলে দূতাবাস মনে করে ।
অনুষ্ঠানের শেষ অংশে শার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স সমবেত শিশুদের সাথে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্মবার্ষিকীর কেক কাটেন। এরপর চিত্রাংকন পর্বে অংশ নেয়া সকল শিশুদের মাঝে পুরষ্কার বিতরণ করা হয়।
১৭ মার্চ সকাল ১০টায় দূতাবাস প্রাঙ্গনে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুর ওপর নির্মিত একাধিক আলেখ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। কোভিড-১৯ পরিস্থিতির উন্নতি হলে বৃহৎ পরিবেশে আরো আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীর স্থগিত অনুষ্ঠানগুলির আয়োজন করা হবে দূতাবাস আশাবাদী।



