দেবাশীষ মুখার্জী, কূটনৈতিক প্রতিবেদকঃ পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে ভাঙ্গনের সুর শোনা যাচ্ছে। রাজ্য বিজেপির অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ নেতা মুকুল রায়, দিল্লিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলীয় বৈঠকে যোগ না দিয়ে কলকাতা ফিরে এসেছেন। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপি সভাপতি দিলীপ ঘোষ, মুকুল রায়ের বৈঠকে যোগ না দেওয়া সম্পর্কে বলেন, চোখের চিকিৎসার জন্য তিনি দ্রুত কলকাতা ফিরে গেছেন। কিন্তু মুকুল রায়ের দিল্লির বাড়ির দেয়াল থেকে, হঠাৎ করে নরেন্দ্র মোদী ও অমিত শাহ-এর ছবি উধাও হয়ে যাওয়ায়, নানা ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়েছে। মুকুল রায়ের পরিবারের তরফ থেকে জানানো হয়েছে যে, ঝড়ের ফলে ওই দুটি ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত, দিল্লিতে এমন কোন প্রলয়ঙ্করী ঝড় হয়নি, যার ফলে অত বড় ছবি দু’টো মুছে যেতে পারে।
মুকুল রায়ের ঘনিষ্ঠমহল সূত্রে জানা গেছে, তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে সদলবলে বিজেপিতে এসে তিনি উপযুক্ত সম্মান পাননি। মুকুল রায়ের আশা ছিল, তিনি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় স্থান পাবেন অথবা রাজ্য বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ কোন পদ পাবেন। অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ মুকুল রায় এক সময় কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করেছেন। আবার তৃণমূল কংগ্রেস ভেঙে বিজেপিতে যোগ দিয়ে বিজেপিকে পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের বিকল্প হিসেবে দাঁড়া করাতে সমর্থ হয়েছেন।
দল ভাঙার দক্ষ কারিগর মুকুল রায়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি ও তার ভাইপোকে, বিখ্যাত পলিসি মেকার প্রশান্ত কিশোরের শরণাপন্ন হতে হয়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েকটা জনমত জরিপে দেখা গেছে, তৃণমূল কংগ্রেসের থেকে জনপ্রিয়তায় বিজেপি সুস্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে আছে। ওই প্রসঙ্গে মুকুল রায়ের অভিমত হচ্ছে, যদি রাজ্যব্যাপী শক্ত সাংগঠনিক শক্তি গড়ে তোলা তোলা না যায়, তাহলে ক্ষমতাসীন তৃণমূল ক্যাডারদের সন্ত্রাসের মুখে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে না।
তৃণমূল কংগ্রেসের মূল শক্তি মুসলমান ভোট। ২০১১ সালের জনগণনা অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম জনসংখ্যা হার ২৭%। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম ভোটারের হার ৩৪%। এই অতিরিক্ত ৭% মুসলিম ভোট – রোহিঙ্গা ও বহিরাগতদের। যাদের এখন খুঁজে পাওয়া যাবে না, কিন্তু ভোটের ঠিক আগে আগে এরা পশ্চিমবঙ্গে চলে আসবে এবং তারা চোখ বন্ধ করে তৃণমূল কংগ্রেসকে ভোট দেবে। কেন্দ্রীয় সরকার চেষ্টা করছে NRC (National Register of Citizens) করে এই ফলস ভোটারদের চিহ্নিত করে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জিও হুমকি দিয়ে রেখেছেন যে, জীবন দিয়ে হলেও তিনি NRC ঠেকাবেন। এহেন জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুকুল রায়ের নিষ্ক্রিয়তা, নিঃসন্দেহে রাজ্য বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা। আবার এমনও গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে যে, মুকুল রায় তৃণমূল কংগ্রেসে ফিরে যাচ্ছেন। মুকুল রায়ের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে; তাই তিনি বিজেপি ছেড়ে যদি তৃণমূল কংগ্রেসের চলে যান, সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা তার বিরুদ্ধে সক্রিয় হয়ে উঠবে।
বিজেপি চেষ্টা করছে, মারদাঙ্গা-বিতর্কিত-অমার্জিত সংস্কৃতির মমতা ব্যানার্জির বিপরীতে, বিধান চন্দ্র রায় কিংবা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মতো পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির সুরুচিসম্পন্ন একজন উচ্চশিক্ষিত মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী খুঁজে বের করতে – যাতে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেনী বিজেপির প্রতি আকৃষ্ট হয়।
এজন্য বিজেপির সম্ভাব্য মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থীদের তালিকায় প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গাঙ্গুলীর নামও উচ্চারিত হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞ মহলের ধারণা, সৌরভের মতো রাজনীতিতে আনকোরা একজন ব্যক্তির পক্ষে সম্ভব হবে না – মমতা ব্যানার্জির মতো একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদকে মোকাবেলা করা। তাদের মতে, যে যত কথাই বলুক,মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে ঘুরেফিরে সেই রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ-এর নামই সামনে চলে আসবে; পরিশ্রমী দিলীপ ঘোষের বিকল্প আপাতত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপিতে নেই।





