দূর্গোৎসব হচ্ছে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের মাধ্যমে মুক্তির ডাক

শ্রী গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিকঃ সনাতন ধর্ম একটি বিজ্ঞান ভিওিক ধর্ম। এর সমস্ত আচার, আচরন প্রথা পুজা পুজা পদ্ধতি সকলই বৈজ্ঞানিকভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অজ্ঞতার কারনে সনাতন ধর্মের অনেক আচার, আচরন ও প্রথাকে অনেকে অবৈজ্ঞানিক বা কুসংস্কার মনে করে। অন্যান্য ধর্মানুষ্ঠানের মধ্যে অতি প্রাচীন অথচ অত্যাধুনিক ধর্মীয় সামাজিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হলো দূর্গাপূজা । বহু মুনী ঋষির সঞ্চিত জ্ঞান ভান্ডার, বহু গবেষনা এবং বহু চিন্তা ভাবনার ফসল, সব মিলে গড়ে তোলা হয়েছে এই দূর্গা প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে কিঞ্চিত আলোক পাত করা যাক।

দূর্গা পূজা সংসদীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার পূর্নাঙ্গ কাঠামোঃ  বেদের দশম মন্ডলের ১২৫ তম সুক্তে দেবী বলেছেন “অহং রাষ্ট্রী” আমি রাষ্ট্র। তিনি দূর্গতি নাশ করেন বলে তিনি দূর্গা। মানুষের দূর্গতি নাশ করতে একটি কল্যাণ কামী, সুশৃস্খল রাষ্ট্র ব্যবস্থা সারা পৃথিবীর পন্ডিত মহলের কাছে স্বীকৃতি লাভ করেছে, সেই কল্যাণকামী সংসদীয় রাষ্ট্র ব্যবস্থার কথা আর্য ঋষিগণ বহু যুগ পূর্বেই চিন্তা  করেছিলেন এবং বাস্তব প্রয়োগও করেছিলেন। আমরা যদি দূর্গা প্রতিষ্ঠানটির কাঠামোগত দিক  লক্ষ্য করি তাহলে এই মহাসত্য আমাদের নিকট পরিষ্কার হবে। আমরা দেখতে পাবো একটি পরিপূর্ণ আদর্শ কল্যাণকামী রাষ্ট্রের প্রতীক তাতে প্রতিফলিত হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদ হলো রাষ্ট্রপতির পদ। তিনি খুব সম্মানীয় ও ক্ষমতার অধিকারী। অথচ সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা শুন্য। আমরা প্রধানমন্ত্রীকে যত সহজে চিনি বা ক্ষমতাশালী মনে করি বা সংবাদপত্রের শিরোনাম হতে দেখি; রাষ্ট্রপতির কপালে তা খুব একটা জুটে না। কারণ হলো সংসদীয় গণতন্ত্র মানেই মন্ত্রীশাসিত সরকার।

রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা এখানে সীমিত। প্রধানমন্ত্রীই সকল ক্ষমতা ও ঐশ্বর্য্যের অধিকারী। এবার দূর্গা প্রতিষ্ঠানটির দিকে লক্ষ্য করা যাক এবং সেই সংগে মহাদেবের প্রতি লক্ষ্য করুন। তিনি সমগ্র প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চে অবস্থান করছেন ঠিকই, কিন্তু সমগ্র প্রতিষ্ঠানটিতে তিনি কত ক্ষমতা হীন ও ভুমিকাহীন। অনেক দর্শকের নিকট মহাদেব, যিনি শুধু দেব নন; দেবাদিদেব অথচ ক্ষমতা ও ভূমিকা হীনতায় সহজে নজরেই পড়ে না । এবার লক্ষ্য করুন প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা। সংসদীয় গনতন্ত্রে প্রধানমন্ত্রী সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। দুষ্টের দমন আর শিষ্টের পালন এবং দেশের সার্বিক উন্নয়নে, এক কথায় তিনি সকল ক্ষমতা, যশ, ঐশ্বর্য্যে মহীয়ান। দেখুন দূর্গার দশটি হাত, অর্থাৎ তিনি  অনন্ত শক্তির অধিকারক। তিনি সদা রণসাজে সজ্জিত, সতত সংগ্রামশীল, তাঁর বাহন পশুরাজ সিংহ। তিনি সেই পশুরাজ সিংহের পিঠে চড়ে রণরণঙ্গিনী বেশে দশ হাতে অসুর বা সন্ত্রাস দমন ও সৎ মানুষদের বরাভয় দিয়ে চলেছেন।

এই প্রতিষ্ঠানটির রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী রুপে অবস্থান করছেন যথাক্রমে মহাদেব ও দূর্গা। তাঁদের  সঙ্গে আছেন বিদ্যাদেবী (শিক্ষামন্ত্রী) সরস্বতী, ধনদেবী (অর্থমন্ত্রী) লক্ষী, দেব সেনাপতি (স্বরাাষ্ট্র^ মন্ত্রী ) কার্তিক ও গন পতি (সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী) গণেশ।

আমরা জানি একটি সুশৃঙ্খল শান্তি ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য চারটি মৌলক জিনিসের  একান্ত প্রয়োজন এবং তা তাহলে অর্থ, জ্ঞান, শক্তি ও জন সমর্থন।

প্রথমতঃ দরকার ধন। অর্থ ছাড়া রাষ্ট্র পরিচালনা সম্ভব নয়। অর্থ ছাড়া মানুষ, সমাজ, জীবন, রাষ্ট্র কিছুই সম্ভব নয়। আর তাই দূর্গার একেবারে দক্ষিন হস্তের পাশে ধনদেবী (অর্থমন্ত্রী) লক্ষীর অবস্থান।

দ্বিতীয়তঃ জ্ঞান; জ্ঞান ছাড়া উন্নত জীবন আশা করা যায় না। রাষ্ট্র, সমাজ, ব্যক্তি সব কিছুর উন্নতির মূলে কাজ করছে শিক্ষা গবেষনা। জ্ঞানীর জ্ঞান গবেষনায়, পন্ডিতের উদ্ভাবনী শক্তি দেশ, জাতি, রাষ্ট্র শোভাময় হয়। বিশুদ্ধ জ্ঞান সমাজ জাতি ও ব্যক্তিকে কলুসতা, মায়া, লোভ-লালসা থেকে রক্ষা করে। দূর্গার বাম পাশে তাই বিদ্যাদেবী সরস্বতী।

এর পর রয়েছেন দেব সেনাপতি কার্তিক। কার্তিক ক্ষত্রিয়, যোদ্ধা, তিনি অগ্নি যেমন ধাতুর খাদ বিনষ্ট করে; তেমনি এই ক্ষত্রিয়, যোদ্ধা, তিনি অগ্নি স্বরুপ, অগ্নি যেমন ধাতুর খাদ বিনষ্ট করে তেমনি এই ক্ষত্রিয় স্বরুপ অগ্নি সমাজ বা রাষ্ট্রের জজ্ঞাল বিনষ্ট করে সমাজকে ক্লেদমূক্ত করে। রাষ্ট্র শান্তিপূর্ণভাবে পরিচালনা, আভ্যন্তরীন শৃঙ্খলা এবং বহিঃ শক্রর আক্রমন প্রতিহত করার জন্যই সেনাবাহিনী, পুলিশ বাহিনী দরকার  তাই কার্তিক সর্বদাই রণ সাজে সজ্জিত।

এর পর আসে জন সমর্থন; জন সমর্থন না থাকলে রাষ্ট্র পরিচালনা করা যায় না। জনগণের সক্রিয় প্রতিনিধিত্ব ছাড়া রাষ্ট্র পূর্নাঙ্গ গণতন্ত্র ও কল্যাণকামী হয়ে উঠে না; তাই আধুনিক যুগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদ। দূর্গা প্রতিষ্ঠানে এই  সংসদেরই প্রতিরুপ হলো গনপতি গনেশ, দূর্গার সর্ব দক্ষিনে গনেশের অবস্থান, তিনি গণপতি অর্থাৎ তিনি সাধারন জনগনের প্রতিনিধি। আধুনিক ভাষায় সংসদ মন্ত্রী । এখানে আমাদের মনে রাখতে হবে যে চারটি,ম্ন্ত্রনালয় আধুনিক যুগের মত সীমিত মন্ত্রনালয় নয় বরং এক একটি বিভাগ মন্ত্রণালয় ।

চলবে——

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।