বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI)-এর একটি প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত এবং বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থানের কারণে ঢাকার প্রতিটি দ্বিপাক্ষিক যোগাযোগ আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর বিশেষ নজরে থাকে। ত্রিদেশীয় কৌশলগত ভারসাম্য
গত ১৫ আগস্ট ২০২৬ বাংলাদেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই (DGFI)-এর ছয় সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তান সফর করছে। এই সংবাদ প্রকাশ্যে আসার পর, ভারতীয় মিডিয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—ঢাকা ও ইসলামাবাদের নিরাপত্তা সহযোগিতা কী নতুন কোনো পর্যায়ে প্রবেশ করছে? তবে ডিজিএফআই-এর এই সফরের সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা আলোচনার বিষয় নিয়ে ঢাকা বা ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো সরকারি বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের যেকোনো স্তরের সামরিক ও গোয়েন্দা সম্পর্ক গভীর হওয়া ভারতের জন্য একটি সংবেদনশীল বিষয়। সীমান্ত নিরাপত্তা ও উত্তর-পূর্ব ভারত: ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সীমান্ত নিরাপত্তা সরাসরি বাংলাদেশের ওপর নির্ভর করে। ঐতিহাসিক সতর্কতা: অতীতে ভারতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার এবং আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের উপস্থিতির তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে দিল্লি বরাবরই সতর্ক ভূমিকা পালন করে। গুপ্তচরবৃত্তি ও সীমান্ত অপরাধ: সীমান্তবর্তী এলাকাকে কেন্দ্র করে ভূখণ্ড ব্যবহার, অবৈধ লেনদেন বা গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করার যেকোনো অভিযোগ ভারতের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
২০২৬ সালের মার্চের শুরুতে বাংলাদেশের ডিজিএফআই প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশিদ চৌধুরী দিল্লি সফর করেন এবং ভারতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারতের বিদেশ মন্ত্রক সেই সফরের কথা নিশ্চিত করেছিল। এরপর এপ্রিলের শুরুতে ডিজিএফআই প্রধান ইসলামাবাদ সফর করেন এবং পাকিস্তানি সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। অর্থাৎ ঢাকার কৌশলটি হলো—একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার বদলে ভারত-পাকিস্তান উভয় পক্ষের সঙ্গে নিরাপত্তা যোগাযোগ রাখা।
গত ৯ আগস্ট ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা RAW-এর প্রধান পরাগ জৈন চার সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকা সফরে যান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই সফরকে ‘রুটিন’ যোগাযোগ হিসেবে বর্ণনা করা হয় এবং বলা হয়; দুই দেশের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা নিয়মিত নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় করেন। এর মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে DGFI প্রতিনিধিদলের পাকিস্তান সফর তাই নিঃসন্দেহে কৌতূহল তৈরি করে।
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক গত দুই বছরে বিভিন্ন ক্ষেত্রে উষ্ণ হয়েছে। বাণিজ্য, কূটনীতি, নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা সহযোগিতা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই যোগাযোগ বেড়েছে।
গত মে মাসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান মাদক পাচার, মাদক-সংক্রান্ত অর্থপাচার এবং আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় একটি ১০ বছর মেয়াদি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এতে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং আইনশৃঙ্খলা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের কথাও রয়েছে।
পাকিস্তানের সামরিক-গোয়েন্দা কাঠামো ঐতিহাসিকভাবে দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়। বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের নিরাপত্তা সম্পর্ক যত গভীর হবে, ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর নজর ততটাই বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক।
বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঠিক পাশেই অবস্থিত। পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে। ফলে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাকিস্তানের গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক শক্তিশালী হলে, তার সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পড়তে পারে।
বিশেষ করে ভারতের অতীত অভিজ্ঞতার কারণে, পাকিস্তানের ISI-কে নিয়ে দিল্লির সতর্কতা বেশি। সীমান্তপারের পাকিস্তান- নিয়ন্ত্রিত জঙ্গি কার্যকলাপ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক পাচার, জাল টাকা এবং গুপ্তচরবৃত্তি—এসব বিষয়ে দীর্ঘ তিক্ত ইতিহাস রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গের থেকে বাংলাদেশে অবৈধ প্রবেশের প্রবেশের চেষ্টার সময়, পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত একজন পাকিস্তানি নাগরিক হাবড়ায় গ্রেপ্তার হয়েছে।
বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গের দিনহাটা বা কোচবিহারকে পাকিস্তানি গুপ্তচরবৃত্তির ‘সেফ জোন’ হিসেবে ব্যবহার করার যে অভিযোগ সামনে এসেছে, সেটিও অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়। একইভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের মাধ্যমে ভারতীয় সিম কার্ড, তথ্য বা যোগাযোগব্যবস্থা পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।
ঢাকা একদিকে দিল্লির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, অন্যদিকে ইসলামাবাদের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে চীনসহ অন্যান্য শক্তির সঙ্গেও অন্তরঙ্গ যোগাযোগ বজায় রাখছে। এটা অনেকটা ‘balancing’ বা ভারসাম্য রক্ষার কৌশল। ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলো প্রায়ই বৃহৎ প্রতিবেশীদের মধ্যে একটি পক্ষের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর না করে একাধিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, বঙ্গোপসাগরের গুরুত্ব এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নৈকট্য—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের কৌশলগত মূল্য পাকিস্তানের কাছে যথেষ্ট। পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা ISI ধর্মীয় নৈকট্যের আবেগে জড়িয়ে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে- ভারতের বিরুদ্ধে গোপন অপারেশন চালাতে পারে। সুতরাং বাংলাদেশে আইএসআই-এর নেটওয়ার্ক পুনরুজ্জীবিত করার আশঙ্কা দিল্লির জন্য একটি বড় নিরাপত্তা ইস্যু।
বিগত বিএনপি সরকারের আমলে (২০০১-০৬) উত্তর-পূর্ব ভারতের সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর বাংলাদেশ ভূখণ্ড ব্যবহারের যে ইতিহাস রয়েছে, সেটার পুনরাবৃত্তি রুখতে ভারত সর্বদা সতর্ক। ফলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে যেকোনো স্তরের সামরিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগ ভারতের নিরাপত্তাবেষ্টনীতে অবশ্যই বাড়তি মনোযোগ আকর্ষণ করবে।
ডিজিএফআইয়ের ইসলামাবাদ সফরকে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে—একটি স্বাভাবিক নিরাপত্তা-যোগাযোগ হিসেবে, নাকি দক্ষিণ এশিয়ার নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে?
বিএনপি সরকার যদি ভারতবিরোধী অপারেশনের জন্য ISI-কে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে অবারিত সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়, তাহলে সেটা হবে বাংলাদেশের নিজের জন্যই সাংঘাতিক ঝুঁকিপূর্ণ।
বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য (Strategic Balancing)
ঢাকা মূলত ভারতের বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক গুরুত্ব স্বীকার করার পাশাপাশি অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তি—যেমন পাকিস্তান ও চীনের—সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করছে। ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর জন্য এটি একটি পরিচিত কৌশল, যার মাধ্যমে তারা কোনো একটি শক্তির ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হয়ে নিজেদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা বজায় রাখে।
ডিজিএফআই-এর এই সফরকে ভবিষ্যৎ ইতিহাস কীভাবে মূল্যায়ন করবে—একটি নিয়মিত নিরাপত্তা যোগাযোগ নাকি আঞ্চলিক ভূরাজনীতির নতুন মাইলফলক—তা নির্ভর করবে ঢাকার নীতি এবং এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ব্যবহারের ওপর। বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা অক্ষুণ্ন রেখে এই ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে প্রধান চ্যালেঞ্জ।




