জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, দিনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

জ্বালানি সংকটে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, দিনে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, এলএনজি সরবরাহে বিঘ্ন, কয়লার সংকট এবং ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন তিন হাজার মেগাওয়াটের বেশি ঘাটতি দেখা দেওয়ায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতির সম্ভাবনা কম। নতুন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংকট পুরোপুরি কাটতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে।

গত কয়েক দিনে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গ্যাসের সংকটে অনেক বাসাবাড়িতে বৈদ্যুতিক চুলার ব্যবহার বেড়েছে। একই কারণে গ্যাসভিত্তিক নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্পকারখানাগুলোও জাতীয় গ্রিডের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে ফ্যান ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বেড়েছে।

জাতীয় গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিনে বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুতের চাহিদা ১৭ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেলেও উৎপাদন ও সরবরাহ সেই অনুপাতে বাড়েনি। এক পর্যায়ে চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮৫৫ মেগাওয়াট। এতে ঘাটতি দাঁড়ায় ৩ হাজার ৩৮২ মেগাওয়াটে। রাতের দিকে কোনো কোনো সময়ে ঘাটতি প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে পৌঁছে।

এলএনজি সংকটে কমেছে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন

বর্তমান সংকটের অন্যতম বড় কারণ এলএনজি সরবরাহে ব্যাঘাত। মহেশখালীর সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নতুন কার্গো খালাসে সমস্যা হচ্ছে। অন্যদিকে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালও কারিগরি সমস্যার কারণে পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে না।

ফলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে। দেশে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও গ্যাসের সংকটে বর্তমানে সেখান থেকে কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।

কয়লা ও আমদানি করা বিদ্যুতেও ধাক্কা

শুধু গ্যাস নয়, কয়লা সরবরাহেও দেখা দিয়েছে সমস্যা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাসে বিঘ্ন ঘটায় কয়েকটি বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পায়রা ও নোরিংকো বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনও কমেছে।

এর সঙ্গে ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও কমে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। আদানি পাওয়ার থেকেও আমদানি কয়েকশ মেগাওয়াট কমেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

গ্রামাঞ্চলে সবচেয়ে বেশি লোডশেডিং

বিদ্যুৎ সংকটে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন গ্রামীণ এলাকার মানুষ। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন এলাকাগুলোতে চাহিদার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কম বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও দিনে ১৫ থেকে ২০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। কোনো কোনো এলাকায় ২৪ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টা বিদ্যুৎ মিলছে।

রংপুর, কুড়িগ্রাম, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, সুনামগঞ্জ ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলার গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় জনজীবন ও শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

ঢাকা ও আশপাশের এলাকাতেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক নয়। কেরানীগঞ্জ, বাড্ডা, পান্থপথ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় দিনে একাধিকবার বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। এতে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, নিরাপত্তা চেয়েছে পল্লী বিদ্যুৎ

দীর্ঘস্থায়ী লোডশেডিং নিয়ে মানুষের ক্ষোভও বাড়ছে। বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ অফিসে হামলা, ভাঙচুর এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের অফিস, উপকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তায় পুলিশের সহায়তা চেয়েছে।

রাত ৮টার মধ্যে মার্কেট বন্ধের নির্দেশ

সংকট মোকাবিলায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। সন্ধ্যা ৭টার পর আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা পরিহারের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

সরকারের আশা, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।

বিকল্প এলএনজি আমদানির উদ্যোগ

জ্বালানি ও বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিকল্প উৎস থেকে এলএনজি আমদানি বাড়ানো এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। এ জন্য মালয়েশিয়া থেকে নতুন এলএনজি কার্গো আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও প্রয়োজন। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, পর্যাপ্ত জ্বালানি আমদানি নিশ্চিত করা, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পূর্ণ সক্ষমতা কাজে লাগানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকটের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।