বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত জ্বালানি তেলের মজুতধারী দেশ ভেনেজুয়েলার প্রায় ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেলসম্পদের উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি বড় ধরনের চুক্তি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ সমঝোতার কথা নিশ্চিত করেছেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তিটি যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনতে পারে। এর ফলে মার্কিন তেলের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম কমানোর সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি দাবি করেছেন।
ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজও চুক্তিটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। তার মতে, দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১৭টি তেলক্ষেত্রে উন্নয়ন
চুক্তির আওতায় ভেনেজুয়েলার ১৭টি কৌশলগত তেলক্ষেত্র উন্নয়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব এলাকায় আনুমানিক ৬৫ বিলিয়ন ব্যারেল তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জানিয়েছে।
এ জন্য দেশটির হাইড্রোকার্বন খাতের অবকাঠামো পুনর্গঠনে ১০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ আসতে পারে। সরকারের হিসাবে, দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প থেকে কর ও অন্যান্য রাজস্ব হিসেবে ২০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় হতে পারে।
চুক্তির আওতায় একটি অভিজ্ঞ বেসরকারি তেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ গঠনের কথা রয়েছে। এতে মার্কিন সরকারের নিয়ন্ত্রণমূলক অংশীদারত্ব থাকবে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেলক্ষেত্রে কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদি অনুমোদন দেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
ট্রাম্পের দাবি, মার্কিন জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়বে
ট্রাম্প বলেছেন, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে মার্কিন করদাতাদের সরাসরি অর্থ ব্যয় করতে হবে না। বরং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগের মাধ্যমে ভেনেজুয়েলার পুরোনো ও দুর্বল তেল অবকাঠামো পুনর্গঠন করা হবে।
তিনি মার্কিন তেল কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলার তেল খাতের অবকাঠামো আধুনিকায়নে বড় ধরনের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন। ট্রাম্পের মতে, উৎপাদন বাড়ানো গেলে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি সরবরাহ শক্তিশালী হবে এবং বাজারে তেলের দামের ওপর চাপ কমতে পারে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এই সমঝোতাকে দুই দেশের জনগণের জন্য বড় অর্জন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার দাবি, ভেনেজুয়েলায় বিপুল বেসরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি হাজার হাজার উচ্চ বেতনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
মাদুরোকে সরানোর পর বদলে যায় পরিস্থিতি
ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক পরিস্থিতির বড় পরিবর্তনের পরই তেলসম্পদ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এই নতুন উদ্যোগ সামনে এসেছে। চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি মার্কিন বিশেষ বাহিনীর অভিযানে ভেনেজুয়েলার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
এর পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বলা হয়, ভেনেজুয়েলায় একটি নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক রূপান্তর নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত দেশটির প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা থাকবে। একই সঙ্গে ভেনেজুয়েলার তেল বিক্রির ওপরও মার্কিন নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ইরান উত্তেজনার মধ্যেই তেল নিয়ে নতুন পদক্ষেপ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান উত্তেজনার কারণে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রেও পেট্রলের দাম নিয়ে রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে ভেনেজুয়েলার বিশাল তেলসম্পদকে কাজে লাগানোর উদ্যোগকে মার্কিন জ্বালানি নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমানে ভেনেজুয়েলায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে। বিভিন্ন হিসাবে দেশটির প্রমাণিত মজুত প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।
তবে বিপুল মজুত থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা, অব্যবস্থাপনা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দেশটির তেল উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যায়। ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে উৎপাদনে বড় ধরনের সক্ষমতা অর্জনের পর গত দুই দশকে ভেনেজুয়েলার তেলশিল্প দীর্ঘ সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে।
নতুন চুক্তির মাধ্যমে দেশটির তেল উৎপাদন ও অবকাঠামো পুনর্গঠন কতটা দ্রুত সম্ভব হয় এবং এর সুফল ভেনেজুয়েলার অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে কীভাবে পড়ে—এখন সেটিই নজরদারির বিষয়।



