বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) আ’লীগে হাসানাত আব্দুল্লাহ, বিএনপিতে একাধিক প্রার্থী

আগৈলঝাড়া (বরিশাল) সংবাদদাতাঃ  বরিশালের গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত হয়েছে বরিশাল-১ আসন। স্বাধীনতা পরবর্তি সময়ে এখানে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ভগ্নিপতি ১৫ আগষ্টের শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত।

সব দলের হিসেবে ৯০’র পর থেকে গনতন্ত্রের যে নতুন যাত্রা তার শুরুতে ৯১’ এবং ৯৬’র নির্বাচনে এখানে জয়ী হন শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাতের পুত্র আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। সেই থেকে তিনিই এখানে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য নেতা। কেবল বরিশাল-১ নয় পুরো দক্ষিনেই তাকে এখন বলা হয় আওয়ামী লীগের অভিভাবক। এমন বাস্তবতায় এই আসনে হাসানাতেই ভরসা স্থানীয় আওয়ামী লীগের। তার সামনে দলের অন্য কেউ মনোনয়নও চাইছেন না। এছাড়া আওয়ামীলীগের কেন্দ্রীয় নেতা এ্যাড. বলরাম পোদ্দারের নামও শোনা যাচ্ছে প্রার্থী হিসেবে। এখানে বিএনপি’র মূল লড়াইটা হচ্ছে হাসানাত ঠেকানোর। সেই লড়াইয়ে বিএনপি কতটুকু এগুতে পারবে সেটাই এখানকার বর্তমান নির্বাচনী ভাবনা।

সর্বশেষ প্রশ্নবিদ্ধ ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনেও এখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হয়েছেন আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ। এর আগে ওয়ান ইলেভেনকালীন সময়ে তার অনুপস্থিতিতে বিএনপি প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানকে হারিয়ে এমপি হন বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. তালুকদার মোঃ ইউনুস। সে সময় আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ দেশের বাহিরে থাকায় তার আস্থাভাজন প্রার্থী হিসেবে এ আসন থেকে প্রার্থী হন ইউনুস।

এই আসনে বিএনপি’র সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির বরিশাল বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপি’র সাধারন সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, বিএনপির সাবেক এমপি এম. জহিরউদ্দিন স্বপন, দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট গাজী কামরুল ইসলাম সজল এবং বরিশাল জেলা উত্তর বিএনপির সহ-সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার ড. এম. শাহ আলম।

এছাড়া জাতীয় পার্টির (এরশাদ) ঢাকা দক্ষিন শাখার সদস্য অ্যাডভোকেট সেকেন্দার আলী, জাপা’র কেন্দ্রীয় সদস্য এস.এম রহমান পারভেজ, গৌরনদী জাপা’র সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউনুস বেপারী, অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাপা’র প্রার্থী আগৈলঝাড়া উপজেলা জাপা’র সাধারন সম্পাদক সরদার হারুন রানা ও উপজেলা জাতীয় পাটির সভাপতি সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার এবং গৌরনদী উপজেলা জামায়াতের সাবেক আমীর হাফেজ মাওলানা মো. কামরুল ইসলাম’র নাম এখানে প্রার্থী হিসেবে শোনা যাচ্ছে।

এখানকার নির্বাচনী ইতিহাস অনুযায়ী ১৯৯১’ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী কাজী গোলাম মাহবুব ওরফে ছরু কাজীকে পরাজিত করে প্রথম বারের মতো এমপি হন আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ। ৯৬ সালের নির্বাচনেও পূনরায় ছরু কাজীকে পরাজিত করে দ্বিতীয় বার এমপি হন তিনি। তখন শেখ হাসিনার সরকার তাকে হাসানাতকে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপের দায়িত্ব দেন। চিফ হুইপ থাকাকালে গৌরনদী ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন মূলক কাজ করান হাসানাত। ২০০১’র নির্বাচনে তাকে পরাজিত করে এমপি হন বিএনপির প্রার্থী দলের তৎকালীন তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এম. জহিরউদ্দিন স্বপন। ৯১’ পরবর্তি সময়ে এটি ছিল হাসানাতের দুর্গে বিএনপি’র প্রথম সফল হানা।

বিএনপি’র এ অবস্থা সর্ম্পকে গৌরনদী উপজেলা আ’লীগের সভাপতি এইচ.এম জয়নাল আবেদীন বলেন, ‘এই আসনে আ’লীগের একক প্রার্থী আবুল হাসানাত আব্দুল্লাহ বিপুল ভোটে জয়লাভ করবে। আ’লীগ সরকার যখন ক্ষমতায় আসে তখন এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট, স্কুল কলেজের ব্যাপক উন্নয়ন হয়। তাই ভোটাররা এলাকার আরো উন্নয়নের স্বার্থে ভোট দিয়ে হাসানাত ভাইকে জয়যুক্ত করবে। বিএনপি বহু গ্র“পে বিভক্ত। তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে হাসানাত ভাই’র জয় শতভাগ নিশ্চিত বলে আমরা মনে করি।’

এখানে বিএনপি নেতারা এক অপরের হাড়ি ভাঙ্গা আর দলকে বহু খন্ডে বিভক্ত করায় ব্যস্ত। যার সূচনা ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে এখানে জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানকে আহ্বায়ক করে ৪৬ সদস্য বিশিষ্ট গৌরনদী উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য মনিরুজ্জামান মনিরকে আহ্বায়ক করে ৪১ সদস্য বিশিষ্ট গৌরনদী পৌর আহ্বায়ক কমিটি ও আব্দুল লতিফ মোল্লাকে আহ্বায়ক করে ৩৪ সদস্য বিশিষ্ট আগৈলঝাড়া উপজেলা আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে। এই তিনটি আহ্বায়ক কমিটিতে জেলা উত্তর বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক আকন কুদ্দুসুর রহমানের হাতে গোনামাত্র কয়েকজন সমর্থক স্থান পায়। আগৈলঝাড়ার বাশাইল গ্রামের বাসিন্দা সোবাহান ইঞ্জিনিয়ারের গৌরনদী উপজেলা বিএনপি’র আহবায়ক হওয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠে। এছাড়া সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপনের কোন সমর্থককে ওই তিন কমিটির কোথাও রাখা হয়নি। এই অবস্থায় সাংবাদিক সম্মেলন করে এই ৩ কমিটি প্রত্যাখ্যান এবং পাল্টা কমিটি ঘোষণার পাশাপাশি কুদ্দুস সমর্থকরা গৌরনদী উপজেলা আহ্বায়ক ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান ও পৌর আহ্বায়ক মোঃ মনিরুজ্জামানকে অবাঞ্ছিত ঘোষনা ও কমিটি বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নামে।

চলমান আন্দোলনের মধ্যেই এসব আহবায়ক কমিটি যার যার ইউনিটের পূর্নাঙ্গ কমিটি করার পাশাপাশি ইউনিয়ন এবং পৌর এলাকায় নতুন কমিটি গঠনের কাজ শেষ করে। বলাবাহুল্য এসব কমিটিতেও রাখা হয়নি কুদ্দুস ও স্বপন সমর্থক কাউকে। এই অবস্থায় ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে আবুল হোসেন মিয়াকে আহ্বায়ক করে উপজেলা বিএনপি আহ্বায়ক কমিটি এবং একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর মনিরুজ্জামান মনিরকে সভাপতি ও শাহআলম ফকিরকে সাধারন সম্পাদক করে পৌর বিএনপির নয়া কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই দুই কমিটি অবশ্য মানে না ইঞ্জিনিয়ার সোবাহান এবং তার সর্মথকরা।

এসব বিষয় নিয়ে আলাপকালে উপজেলা সদরে আসতে না পারার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে গিয়ে বিএনপির সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বিএনপির নীতি নির্ধারকরা আমাকে নির্বাচন করার জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেছেন। তাই আমি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি। এ বছরও কোরবানীর ঈদে গ্রামের বাড়ি গৌরনদীর শরিকলে ছিলাম। তাছাড়া মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে আমি সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছি। তিনি আরো বলেন যেহেতু আমি এর আগেও দুইবার সংসদ সদস্য ছিলাম তাই এই আসনে বিএনপির প্রার্থীকে জিতানোর দ্বায়িত্বও আমাকে দিয়েছে দলের চেয়ারপাসন। আর স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও তার সাথে রয়েছেন বলে দাবী করেন তিনি।

দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও গেীরনদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহান বলেন, আন্দোলন সংগ্রামে অংশ গ্রহন করায় ঢাকায় পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করেছিল। উপজেলা ও পৌর নির্বাচনে এলাকায় দলীয় প্রার্থীর পক্ষেও নির্বাচনী প্রচারনায় গিয়েছিলাম। তাছাড়া বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করা ছাড়াও তৃণমূল কমিটি গঠনে তিনি ভুমিকা রেখেছেন বলে দাবী করেন। তিনি আরো বলেন, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল আমাকে প্রার্থী মনোনিত করেছিল। আশাকরি আসন্ন সংসদ নির্বাচনেও দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে। আগৈলঝাড়া উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহাবুবুল ইসলাম মাহাবুব বলেন, এ আসনের সাবেক এমপি জহির উদ্দিন স্বপনকে ওয়ান এলেভেনের পর আর এলাকায় দেখা যায়নি। এমনকি তারেক রহমানের জন্মদিন পালন উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচীতেও তাকে পাওয়া যায়নি। তাই ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানের মত প্রার্থী চায় স্থানীয় বিএনপি। যাতে করে সব সময় তাদের পাশে পাওয়া যায়।

আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি’র পাশাপাশি এখানে মাঠে সক্রিয় আছে জাতীয় পার্টি। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসন থেকে জাপা’র মনোনয়ন পেয়েছিলেন আগৈলঝাড়া উপজেলা জাপা’র সাধারন সম্পাদক সরদার হারুন রানা। তখন তিনি জামানত হারিয়েছেন। মনোনয়ন প্রত্যাশী গৌরনদী উপজেলা জাপার সভাপতি অ্যাডভোকেট ইউনুস বেপারীও এলাকায় দলীয় কর্মকান্ড করে যাচ্ছেন।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।