রংপুরে একই পরিবারের চার সদস্য হত্যার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র বা সিন্ডিকেট জড়িত থাকলে তাদের গোপন আস্তানা খুঁজে বের করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৬ আগস্ট) পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নিচতলায় আয়োজিত মিলাদ ও দোয়া মাহফিলে তিনি এ দাবি জানান। অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদসহ বিএনপির শীর্ষ নেতা এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
রিজভী বলেন, রংপুরের ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের পেছনে যেসব অপরাধী বা সিন্ডিকেট জড়িত, তাদের চিহ্নিত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাদের গোপন আস্তানা খুঁজে বের করে দ্রুত নির্মূল করার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
দেশে মাদকের বিস্তার রোধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে রিজভী বলেন, মাদকসেবী ও মাদক কারবারিরা যাতে কোনোভাবেই আইনের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেতে না পারে, জনগণ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে এমন নিশ্চয়তা প্রত্যাশা করে।
রংপুরে একই পরিবারের চারজন নিহত
গত শুক্রবার (২১ আগস্ট) ভোররাতে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় নিজ বাড়িতে খুন হন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ও মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী।
ঘটনার পর পুলিশ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে। তারা হলেন মাছুয়াপাড়া এলাকার মুগ্ধ দাস ও তার মামাতো ভাইয়ের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ ও তদন্তে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে।
ইয়াবা সেবনের পর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগের রাতে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ এক মাদক কারবারির কাছ থেকে ইয়াবা সংগ্রহ করেন। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তির বাসায় বসে তারা মাদক সেবন করেন।
রাতের শেষ দিকে তারা একটি নির্মাণাধীন ভবনের ছাদ হয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যান। সেখানে মাদক সেবনের সময় শব্দ হলে বিষয়টি দেখতে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে ওঠেন। এ সময় তাকে গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয় বলে পুলিশের দাবি।
শব্দ শুনে তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ছাদে যাওয়ার পথে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ। পরে মায়ের চিৎকার শুনে মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তী সেখানে গেলে তাকেও হত্যা করা হয়।
পুলিশ আরও জানায়, গণপতি চক্রবর্তীর ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর সঙ্গে অভিযুক্ত সিদ্ধার্থের ছোট ভাইয়ের পরিচয় ছিল। পরে প্রিয়মকেও হত্যা করা হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
হত্যার পর ডাকাতির নাটক সাজানোর অভিযোগ
পুলিশের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তরা বাড়ির বাথরুমে গিয়ে গোসল করেন এবং পরে ঘরে থাকা খাবার খান। এরপর তারা আবার মাদক সেবন করেন।
তদন্তকারীরা আরও জানান, দুটি স্মার্টফোন থেকে সম্ভাব্য ফিঙ্গারপ্রিন্টের আলামত নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ফোন দুটি চুবিয়ে রাখা হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাড়িতে থাকা স্বর্ণালংকার পরীক্ষা করতে আগুন জ্বালানোরও অভিযোগ রয়েছে। পরে স্বর্ণালংকার নিয়ে তারা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান এবং ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে ঘরের বিভিন্ন জিনিসপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখেন।
পরে মন্দিরের পেছনে একটি পরিত্যক্ত বাড়িতে স্বর্ণালংকারগুলো লুকিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশ জানায়। সেখান থেকে সেগুলো উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদক ও অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের দাবি
রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডের পর মাদক, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গন থেকেও ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে কঠোর শাস্তির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
রিজভীর বক্তব্যে অপরাধী চক্রের পাশাপাশি মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধেও কঠোর অভিযান পরিচালনার আহ্বান উঠে এসেছে। হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্রের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না—তদন্তে এসব বিষয় আরও পরিষ্কার হবে।



