মানুষের ধর্ম কি মতবাদ না গুণ

মানুষের ধর্ম কি মতবাদ না গুণ

সমাজে অধিকাংশ মানুষ আছেন যারা মনে করেন ধর্ম মানুষের জন্য আলাদা আলাদা হয়। যেমন মনে করেন— ইসলাসম একটি ধর্ম, খ্রীষ্টান একটি ধর্ম, বৌদ্ধ একটি ধর্ম গো টে আদি আদি। আসলে এগুলো প্রকৃত পক্ষে কোনো ধর্ম নয়, একেকটি ব্যক্তি বিশেষের তৈরী করা মতবাদ বা পন্থা।

ইসলাম মতবাদের প্রবক্তা হজরত মোহাম্মদ (অবতার ভাবা)১৪০০ বছর আগে সৃষ্টি , খ্রীষ্টান মতবাদ তৈরী করেন যীশু খ্রিষ্ট(অবতার ভাবা)২০০০ বছর আগে সৃষ্টি, বৌদ্ধ ধর্মের গৌতম বুদ্ধ(অবতার ভাবা)২৩০০ বছর আগে সৃষ্টি । হিন্দুরা যেমন বিভিন্ন মনুষ্য কে অবতার এর সঙ্গে কল্পনা করে বিভিন্ন ধর্ম বলে চালাচ্ছেন এর মধ্যে স্পেশাল হলো বৈষ্ণব মতবাদ। হিন্দুদের বেশি মতবাদ এর জন্য বেশি বিভক্ত হিন্দু দের বিভিন্ন মতবাদ সৃষ্টি আনুমানিক ৩০০০ বছর আগে এখন চলছে। হিন্দুদের অবতার এর নাম উল্লেখ করছি না তাহলে লেখা অনেক বড়ো হয়ে যাবে । বৈদিক সনাতন ধর্ম মনুষ্য সৃষ্টির সূচনা হতে ১৯৬ কোটি বছর।

ছোটবেলায় ভাবতাম আমি মানুষ তো একই কিন্তু বিভিন্ন জাতির বিভিন্ন ঈশ্বর কল্পনা কেনো? তাহলে কাদের ঈশ্বর টি ঠিক? তার পর রামকৃষ্ণ জি বলে গেছেন আল্লাহ ঈশ্বর ও গড একই, যত পথ তত মত?আমি দুশ্চিন্তার মধ্যে পরেগিয়েছিলাম তাহলে কোন পথে ঈশ্বরের সংবিধান অনুযায়ী ধর্ম কর্ম করলে মুক্তি পাওয়া যায়? তখন থেকেই আমি চঞ্চল ছিলাম সত্য আমাকে জানতেই হবে। এই বিশ্ব মাঝারে এত মতবাদ সেগুলি লক্ষ্য করলাম প্রত্যেকটি পরস্পরের বিরোধী তখন আমি নিশ্চিত সবই তাহলে সত্য হতে পারে না একটি সত্য হলে বাকি গুলি মিথ্যা অবশ্যয়। আমি চিরকালই যুক্তিবাদী ও বিজ্ঞান মনষ্ক কোনো অলৌকিক অযুক্তি কখনোই ধর্ম হতে পারে না সেটা মতবাদ হতে পারে যা ব্যাবসার  জন্য কারণ ধর্ম কখনোই ব্যাবসা হতে পারে না। ঠিক কিছুই বছর যাবৎ পূর্বে আমি এক আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত ডিগ্রিধারী  এবং বৈদিক সিদ্ধান্ত কারী ব্যাক্তির সঙ্গে পরিচয় হয় তখন আমার জীবনে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয় সেই মহান বেক্তি একটা গুরুত্ব পূর্ণ কথা আমাকে বলে ছিলো যা সারাজীবন মনে থাকবে। আমরা ইতিহাস,ভূগোল ও বিজ্ঞান সবিতেই যদি যুক্তি বিজ্ঞান খুঁজি না হলে মিথ্যা তাহলে ধর্মের বেলায় কেনো অন্ধবিশ্বাস করবো?? তার পর একের পর হিন্দুদের বিভিন্ন শাস্ত্র পুরাণ,গীতা, ও সাথে সাথে বাইবেল, কোরান হাদিস ফোলো করতে থাকি তার সঙ্গে জোরকদমে বৈদিক শাস্ত্র বেদ ও উপনিষদ চর্চা করি তখন বুঝলাম ধর্ম কি ও মতবাদ কি? ছোটো বেলায় পড়েছিলাম ১ চন্দ্র,২ পক্ষ,৩ নেত্র, ৪ বেদ ব্যাস এই টুকুই তার পর এটাও জানতাম হিন্দুদের প্রাচীন ধর্মীয় শাস্ত্র হলো বেদ এবং এটাও জানলাম কেনো আমাদের বেদ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হলো? কিন্তু আমি গর্বিত আমার এই জিবনে বেদ শাস্ত্র পড়ার সুযোগ পেয়েছি কারণ বহু মানুষ জন্ম হয় এবং মৃত্যু হয় কিন্তু তাদের সুযোগ হয় না ও অনেকেই সুযোগ থাকা সত্বেও পড়ে না অন্ধকারেই হারিয়ে যায়।বেদ শাস্ত্র পড়ার পর আমি যেনো আবার নতুন করে জন্ম পেয়েছি ,খুব ভালো লাগছে সত্য জানতে পেরেছি তাই ধর্ম যুদ্ধ করতে সুবিধা হবে।

এবার আসি অন্য আলোচনায় বিভিন্ন পুরাণ এবং রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে যা জানলাম যুগে যুগে ধর্ম ও অধর্মের সংঘর্ষ হয়েছে কিন্তু বরাবর সব সময় ধর্মের ন্যায় প্রতিষ্ঠা অবশেষে হয়েছে কিন্তু কোনো অবতার আসেনি মানুষই যুদ্ধ করেছেন এখনও যুদ্ধ হচ্ছে আগামী দিনে ও হবে শেষ হওয়ার নয় তবে হ্যাঁ যখনই অধর্মের বিস্তার লাভ করে তখনই বিশালাকার যুদ্ধ হয় আর ধর্মের বিস্তার হলে শান্তির সংসার পরিণত হয় তাই আমাদের লক্ষ্য থাকবে ধর্মের বিস্তার করা সেটা যুদ্ধ করতেও হতে পারে, এই দুই উপমা আমরা রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে পায়।বেদ মান্য ঋষিদের গ্রন্থ উপনিষদ গুলি পরিচয় করিয়ে দেই যে বৈদিক সনাতন ধর্ম মান্যতা ছিলো মহাভারত পর্যন্ত কিন্তু  মহাভারতের যুদ্ধের পর ওই যুদ্ধে বহু বিদ্বান পণ্ডিত গণ মারা যায় তার পর নেবে আসে অন্ধকার দিন এই বিদ্বান পণ্ডিত দের অভাবে ব্রাহ্মণ বাদ ও এক এক করে বহু মতবাদ সৃষ্টি হয় এই বিশ্ব মাঝারে তাই আজ এতো অশান্তি এর মধ্যে একটি মতবাদ খুবি ভয়ন্কর যা অন্য মতবাদে বিশ্বাসী মানুষ দের সহ্য করতে পারেন না অসুরদের মত আচরণ কিন্তু বাকি মতবাদ গুলির মধ্যে যথেষ্ঠ মিলবন্ধন রয়েছে কিন্তু কারো বিপদে কেউ আসবে না।এর পর চর্চা করতে থাকলাম এই বিশ্ব মাঝারে যেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বী বেশি ছিলো এবং ভূমিও বেশি ছিলো তা সত্বেও কেনো এরা নিজেরা ও মাতৃ ভূমি অবক্ষয় করে চলছে অসুরদের কাছে,,যা গভীর চর্চা করার পর বুঝতে পারলাম এদের দিন কে দিন জনসংখ্যা কম হওয়া সত্বেও ক্রমশ মতবাদ ও অবতার বাদ বেড়ে চলছে কারো সঙ্গে কারো মতামতের ঠিক নেই এবং নেই কোনো একতা এবং উচ্চ বর্ণ দ্বারা আক্রান্ত জাতপাত বিভাগ সব মিলিয়ে ককটেল ও জগাখিচুড়ী কে রক্ষা করবে এই হিন্দু জাতি কে?? অসুরদের তাণ্ডব সব সময় থাকবে যারা বর্তমান পরিস্থিতিতে কম হওয়া সত্বেও এক মত এক পথ যুক্তি পূর্ণ বৈদিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলার চেষ্টা করবে না তাদের কোনো অবতার এসে রক্ষা করেনি ভবিষ্যতে ও রক্ষা করবে না নিজেদের অবস্থান নিজেদেরই রক্ষা করতে হবে এটাই ঈশ্বরের সংবিধান।

এবার ফিরি আসল আলোচনায় __

ধর্ম স্রষ্টার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়, কোনো ব্যক্তি বিশেষের দ্বারা নয়। যেমন— আগুনের ধর্ম তাপ প্রদান করা, বরফের ধর্ম শৈত্য প্রদান করা আদি। অনুরূপ ভাবে মানুষমাত্রেই ধর্ম হল “মানবতা”। পরমপিতা পরমেশ্বর সৃষ্টির আদিতেই মানুষকে “মানবতা” ধারণ করার জ্ঞান দিয়েছেন বেদে। এই বেদ অনুসারে কর্ম করাই ধর্ম। তাই মানবতাকে ধারণ করা সকল মানুষের ধর্ম।

আর একটা কথা আপনাদের জানিয়ে রাখি ধর্মের কোনো নাম হয়না । এ কথা শুনে এখন অনেকেই মনে প্রশ্ন জাগতে পারে যে আমাদের ধর্মের নাম “সনাতন” বা “বৈদিক ধর্ম” কেন বলি ?

আসলে এটা আমাদের বোঝার একটা ভুল । আমরা ধর্ম কে ‘সনাতন বৈদিক ধর্ম’ এই জন্যই বলি কারণ ধর্ম হলো ‘সনাতন’ অর্থাৎ “অনাদি” , “শাশ্বত” , “চিরন্তন” ,  “অপরিবর্তিত” ।

ধর্মের কোনো আদি বা অন্ত নেই , আর আমরা যে সৃষ্টিতে এখন আছি এই সৃষ্টিই প্রথম, এমনটা কেউ ভাববেন না। কারণ এমন সৃষ্টি, স্থিতি, প্রলয় কোটি কোটি বার হয়েছে আর হতেই থাকবে। আর প্রতি সৃষ্টিতেই ধর্ম বিদ্যমান ছিল, যার কারণে আমরা ধর্মকে “সনাতন” বলে কথন করি এবং বেদের জ্ঞান দ্বারা আমাদের ধর্মের উৎপত্তি হওয়া কারণে আমরা আমাদের ধর্মকে “সনাতন বৈদিক ধর্ম” বলি।

সংস্কৃত “ধৃ” ধাতু থেকে “ধর্ম” শব্দটির উৎপত্তি হয়েছে। যার ধাতুগত অর্থ হল “ধারণ করা”।  ‘ধার্য়তে ইতি ধর্ম’ অর্থাৎ যা ধারণ করা হয় তা হলো ধর্ম। যে বস্তু যে গুন ধারণ করে সেটাই সেই বস্তুর ধর্ম। যেমন ধরুন — আগুনের ধর্ম তাপ ও আলো প্রদান করা , বরফের ধর্ম শীতলতা প্রদান করা আদি । এই বস্তু গুলো কখনো কি তাদের এই গুনগুলোকে ত্যাগ করতে পারবে নাকি করা সম্ভব ?

এখন আমি যদি বলি যে—

আগুন কি কখনো শীতলতা প্রদান করতে পারবে ?

বরফ কোনো দিন উত্তাপ প্রদান করতে পারবে ?

উত্তর হবে — না , কখনোই পারবে না ।

কারণ যে বস্তুর যে গুন তা সে কখনোই ত্যাগ করতে পারবে না। ঠিক অনুরূপ ভাবেই মানুষমাত্রে গুন হবে “মানবতা”, এবং এই “মানবতা” সকল মানুষমাত্রেরই ধর্ম।

বৈশেষিক দর্শনে কণাদ মুনি ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছে—

“য়তো অভ্যুদয় নিঃশ্রেয়সসিদ্ধিঃ স ধর্ম”।

[ বৈশেষিক দর্শন ১ম অধ্যায়/১ম আহ্নিক/২য় সূত্র ]

অর্থাৎ যা দ্বারা যথার্থ উন্নতি এবং পরম কল্যাণ লাভ হয় তাই ধর্ম।

মহাভারত শান্তি পর্ব ১০৯/১১ শ্লোকে বলা হয়েছে —

“যাহার দ্বারা লোক রক্ষা হয় তাই ধর্ম”।

মহর্ষি দয়ানন্দ সরস্বতী ধর্মের সংজ্ঞা দিয়েছেন—

যাহার স্বরূপ ঈশ্বর আজ্ঞার যথাবৎ প্রতিপালন এবং পক্ষপাতরহিত হইয়া ন্যায় অনুসারে সকলের হিত সাধন করা, যাহা প্রত্যক্ষাদি প্রমাণ দ্বারা সুপরিক্ষিত এবং বেদোক্ত হওয়ায় সর্ব মানবের পক্ষে একমাত্র মান্য তাঁহাকে ধর্ম বলে।

পণ্ডিত ব্রহ্মদত্ত জী বলছেন— “ধারয়তি লোকম” অর্থাৎ যা লোককে ধারণ করে তাহাই ধর্ম।

মনুসংহিতায় মহর্ষি মনু মহারাজ ধর্মের ১০টি লক্ষণ সম্পর্কে বলেছেন —

ধৃতিঃ ক্ষমা দমোস্তেয় শৌচমিন্দ্রিয়নিগ্রহঃ।

ধীর্বিদ্যা সত্যমক্রোধো দশকং ধর্মলক্ষণম্।।

— মনুস্মৃতি ৬/৯২ শ্লোক

অর্থাৎ , ধৃতি (যা পেয়েছ তাতেই সন্তুষ্ট থাকা), ক্ষমা (নিন্দা স্তুতি, মান অপমান, ক্ষতি লাভ আদি দুঃখের মধ্যেও সম অবস্থায় থাকতে হবে, অর্থাৎ বলা যায় যে কেউ যদি নিন্দা করে তাহলে বেশি দুঃখী হওয়া যাবেনা আবার কেউ যদি নানান প্রকার স্তুতি করে তবুও বেশি সুখী হওয়া চলবে না), দম (আত্ম নিয়ন্ত্রণ), অস্তেয় (অনৈতিক বিষয় হতে বিরত থাকা, বা চুরি না করা), শুচিতা (রাগ, দ্বেষ আদি পক্ষপাতী বিষয়কে ত্যাগ করে ভিতরের পবিত্রতা এবং দেহের বাইরের পবিত্রতা রাখতে হবে ), ইন্দ্রিয় নিগ্রহ (ইন্দ্রিয়সমূহকে লোভ্য বস্তু থেকে বিরত রাখা), ধী (বুদ্ধি অর্থাৎ বিচার বিবেচনা করতে হবে), বিদ্যা  (পৃথিবী হতে পরমাত্মা পর্যন্ত যথার্থ জ্ঞান এবং সেই জ্ঞানে উপকার নেওয়া), সত্য (যে পদার্থ যেমন তাকে তেমন বোঝা, তেমন বলা এবং তেমনই করা হলো সত্য), অক্রোধ (ক্রোধ হওয়ার কারণ থাকা সত্তেও ক্রোধ না করা) এই দশটি হচ্ছে ধর্মের লক্ষণ।

এই লক্ষণ গুলি যে মানুষের মধ্যে আছে তিঁনিই প্রকৃত ধার্মিক। কিন্তু আমরা ধর্মকে বিভিন্ন মত পথে বিভক্ত করে তা মান্য করছি, তাই এটা ভুল। আমরা মানুষরা ধর্মকে কখনোই পরিবর্তন করতে পারবো না। মানুষ যা পরিবর্তন করতে পারে তা হল “সম্প্রদায়”, “মত”, “পন্থা” ইত্যাদি।

ধর্মের কাজ হচ্ছে মানুষের সাথে মানুষের প্রীতি স্থাপন করা, কিন্তু যা মানুষের সাথে মানুষের বিভেদ সৃষ্টি করে সেটা কখনোই ধর্ম হতে পারে না। তাহলে আপনারা আশা করি বুঝতে পারছেন যে ধর্মের দ্বারা কেবল আমাদের উন্নতি নয়, জগতের কল্যাণও নিহিত আছে। ধর্ম  কোনো অন্ধবিশ্বাস বা কুসংস্কার নয়। ধর্ম হল মনুষ্য জাতির গুনগত কিছু বৈশিষ্ট, যা ধারণ করেই ধার্মিক হতে হয়।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
Brinda Chowdhury
লেখক / প্রতিবেদক

Brinda Chowdhury

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।