ওয়াশিংটনে ট্রাম্প-শি ঐতিহাসিক বৈঠক: প্রথাভাঙা রাজকীয় সংবর্ধনা, বাণিজ্য বিরতি ও ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক নজিরবিহীন ও দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। চিরাচরিত মার্কিন কূটনৈতিক প্রথা ভেঙে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিজেই সামরিক বিমানঘাঁটিতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট ও তাঁর সহধর্মিণী পেং লিউয়ানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওয়াশিংটনের এই পদক্ষেপ বিশ্বমঞ্চে চীনের সমকক্ষ পরাশক্তি হওয়ার বাস্তবতাকে অনানুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেওয়ারই ইঙ্গিত দেয়।
বিমানবন্দরে অভূতপূর্ব সামরিক সম্মাননা
সাধারণত ওয়াশিংটনে কোনো বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান এলে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা তাঁদের হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানান। তবে এই সফরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ওয়াশিংটনের জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুস সামরিক বিমানঘাঁটিতে উপস্থিত হয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে গ্রহণ করেন।
রানওয়েতে বিছানো প্রায় ১০০ ফুট দীর্ঘ লালগালিচায় দাঁড়িয়ে দুই নেতাকে সামরিক অনার গার্ড দেওয়া হয়। এ সময় বাজানো হয় দুই দেশের জাতীয় সংগীত। সংবর্ধনার অন্যতম বিশেষ আকর্ষণ ছিল মার্কিন সামরিক যুদ্ধবিমানের একটি আকর্ষণীয় ‘ফ্লাইওভার’ (Military Flyover)।
সাউথ লনে বর্ণাঢ্য ‘স্টেট ডিনার’ ও উপহার বিনিময়
বিমানঘাঁটির প্রথাভাঙা সংবর্ধনার পর হোয়াইট হাউসের সাউথ লনে একটি বর্ণাঢ্য দ্বিপাক্ষিক রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের (State Dinner) আয়োজন করা হয়। ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প ও প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই নৈশভোজে দুই দেশের শীর্ষ প্রযুক্তি খাত ও ব্যবসায়ী টাইটানরা অংশ নেন।
নৈশভোজ চলাকালে উভয় নেতা দুই দেশের চমৎকার দ্বিপাক্ষিক বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। এই সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনা প্রেসিডেন্টকে আমেরিকার জাতীয় প্রতীক ‘ন্যাড়া ঈগল’ (Bald Eagle)-এর একটি ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য উপহার দেন।
বাণিজ্য যুদ্ধ স্থগিত ও ‘থুসিডাইডস ট্র্যাপ’ প্রসঙ্গ
দুই পরাশক্তির এই বৈঠকে উঠে আসে চলমান অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের বিষয়টি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আমেরিকা ও চীন তাদের মধ্যকার বাণিজ্য যুদ্ধে শুল্ক স্থগিতের মেয়াদ (Trade Truce) আরও বৃদ্ধি করতে সম্মত হয়েছে।
বৈঠকে প্রাচীন অর্থনৈতিক ও ঐতিহাসিক তত্ত্ব ‘থুসিডাইডস ট্র্যাপ’ (Thucydides Trap)-এর উদাহরণ টেনে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেন, “বিশ্বে উদীয়মান শক্তি এবং প্রতিষ্ঠিত শক্তির মধ্যকার সংঘাত কোনো অবশ্যম্ভাবী বিষয় নয়; পারস্পরিক কূটনীতির মাধ্যমে এই সংঘাত এড়ানো সম্ভব।”
কোয়াড, জাপান ও ভারতের কৌশলগত উদ্বেগ
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের এই ঘনিষ্ঠ অবস্থান এবং নীতি পরিবর্তন এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন মেরুকরণের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জাপান ও ভারতের ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই অতি-উষ্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ককে গভীর উদ্বেগ এবং এক ধরনের কৌশলগত ‘হাই অ্যালার্ট’ হিসেবে দেখছেন।
ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান আধিপত্য ঠেকাতে আমেরিকা, ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান মিলে যে ‘কোয়াড’ (Quad) জোট গঠন করেছিল, ওয়াশিংটনের এই আকস্মিক পদক্ষেপে সেই জোটের ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে জাপান চরম শঙ্কায় রয়েছে যে, চীনের সঙ্গে বড় ধরনের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সমঝোতা করার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসন তাইওয়ানের সুরক্ষায় আপস করতে পারে। ইতোমধ্যেই তাইওয়ানের জন্য বরাদ্দকৃত ১৪ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র চুক্তি স্থগিত রেখেছে ওয়াশিংটন। মার্কিন সুরক্ষার ওপর পূর্ণ আস্থা হারিয়ে জাপান এখন তাদের জাতীয় সামরিক বাজেট দ্বিগুণ করার পরিকল্পনা ত্বরান্বিত করছে।





