দেশে মাদকের বিস্তার, মাদক সিন্ডিকেটের প্রভাব এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অপরাধ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তাঁর ভাষ্য, বিগত ১৭ বছরে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের পাড়া-মহল্লায় মাদকের আস্তানা গড়ে উঠেছে। মাদক নির্মূলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও সাধারণ জনগণের সম্মিলিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।
রোববার (২৫ অক্টোবর) দুপুরে নিজের জেলা বাগেরহাটের পুলিশ লাইনস মিলনায়তনে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, কিশোর গ্যাং ও উগ্রবাদবিরোধী কমিউনিটি পুলিশিং সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইজিপি।
মাদকের বিস্তার ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ
আইজিপির বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে দেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা যায়, মাদক নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, অপরাধী চক্রের তৎপরতা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের সম্ভাব্য যোগসাজশের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অতীতে মাদক ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে আলোচনায় এসেছে।
কক্সবাজারের সাবেক সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদির নাম মাদক ব্যবসা নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় বহুবার এসেছে। তবে মাদক ব্যবসায় রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা কোনো ব্যক্তির অপরাধে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত করতে নির্ভরযোগ্য তথ্য, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার গুরুত্ব অপরিসীম।
মাদকের বিস্তার শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্য, পারিবারিক স্থিতিশীলতা, তরুণ প্রজন্মের ভবিষ্যৎ এবং দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্যও বড় চ্যালেঞ্জ।
মাদকের ভয়াবহ প্রভাব পরিবার ও সমাজে
মাদকাসক্তির কারণে দেশের বহু পরিবারকে আর্থিক সংকট, মানসিক চাপ ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। পরিবারের কোনো সদস্য মাদকাসক্ত হয়ে পড়লে তাঁর চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব অনেক সময় পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর এসে পড়ে।
বিশেষ করে কিশোর ও তরুণদের মধ্যে মাদকের ঝুঁকি উদ্বেগজনক। মাদকাসক্তি শিক্ষাজীবন ব্যাহত করতে পারে, কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে এবং ব্যক্তির শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে মাদক সংগ্রহের জন্য অর্থের জোগান, অপরাধী চক্রের প্রভাব এবং পারিবারিক দ্বন্দ্ব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি ঘৃণা বা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার পরিবর্তে চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি মাদক সরবরাহকারী ও অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
মাদক নির্মূলে প্রয়োজন কঠোর ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ
দেশকে মাদকের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে হলে মাদক উৎপাদন, চোরাচালান, সরবরাহ, বিক্রি ও বিতরণের সঙ্গে জড়িত নেটওয়ার্ক চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক প্রভাব কিংবা সামাজিক অবস্থান যেন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সীমান্তরক্ষী বাহিনী এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করতে হবে। মাদকের উৎস, সরবরাহপথ, অর্থায়ন এবং অপরাধী চক্রের আর্থিক লেনদেন অনুসন্ধানের মাধ্যমে সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগ নিতে হবে।

একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে পাড়া-মহল্লায় মাদকবিরোধী সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।
জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ উদ্যোগ
মাদক নির্মূলের দায়িত্ব শুধু সরকারের বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার নয়। স্থানীয় জনগণের সহযোগিতা ছাড়া মাদক ব্যবসার বিস্তার রোধ করা কঠিন। সন্দেহজনক মাদক ব্যবসা সম্পর্কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য দেওয়া, তরুণদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা এবং পরিবারে সচেতন পরিবেশ তৈরি করার মাধ্যমে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
তবে মাদকবিরোধী অভিযানে নিরপরাধ কাউকে হয়রানি করা যাবে না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
মাদক নিয়ন্ত্রণে কমবে অপরাধের ঝুঁকি
মাদক ও অপরাধের মধ্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে যোগসূত্র রয়েছে। মাদককে কেন্দ্র করে চোরাচালান, সহিংসতা, চাঁদাবাজি এবং অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত হতে পারে। তবে সব মাদকাসক্ত ব্যক্তি অপরাধে জড়িত—এমন ধারণা সঠিক নয়। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে মাদক সরবরাহকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের বর্তমান আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মাদকবিরোধী অবস্থানকে গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের আলোকে এখন প্রয়োজন কার্যকর পরিকল্পনা, জবাবদিহি এবং মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ।
মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে শুধু বক্তব্য বা অভিযান নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক কর্মসূচি। মাদক ব্যবসার পৃষ্ঠপোষকতা ও অপরাধী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ ব্যবস্থা, তরুণদের জন্য শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ, আসক্তদের চিকিৎসা এবং জনসচেতনতা—এই চারটি ক্ষেত্রে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।
মাদকবিরোধী লড়াইকে সফল করতে হলে অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোরতা এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রতি মানবিকতা—দুটিই নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পরিবার, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখার পথ আরও সুগম হবে।





