স্ট্যাম্পের কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন যশোর ডিসি অফিসের প্রধান করণিক

যশোর থেকে ই. আর. ইমনঃ যশোর ডিসি অফিসের ট্রেজারী শাখার প্রধান করণিক আব্দুর রউফের বিরুদ্ধে ব্যাপক অর্থবাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। স্ট্যাম্প সংকটের ভয় দেখিয়ে ভেন্ডারদের জিম্মি করে তিনি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। টাকা না দিলে ভেন্ডারদের চাহিদার অনুপোযোগী স্ট্যাম্প সবরাহ করা হয়। দীর্ঘদিন যাবত অনৈতিকভাবে সুবিধা আদায় করা হলেও ভয়ে কেউ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।

স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের অভিযোগে জানা গেছে ,যশোরে প্রায় ১৯০ জন স্ট্যাম্প ভেন্ডারের লাইসেন্স রয়েছে। ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে ডিসি অফিসের ট্রেজারী শাখায় চালান দিয়ে তারা স্ট্যাম্প তুলে নেন ভেন্ডারেরা। প্রতি বুধবার ট্রেজারী শাখা হতে এ স্ট্যাম্প সরবাহ করা হয়। কিন্তু ট্রেজারী শাখায় চালান জমা দিয়েও ঘুষ ছাড়া স্ট্যাম্প তুলে নিতে পারছেন না ভেন্ডারেরা। ভেন্ডারদের চাহিদা অনুযায়ী স্ট্যাম্প নিতে রেট ভেদে ঘুষের টাকা দিতে হয়। অন্যথায় নিতে বাধ্য করা হচ্ছে চাহিদার অনুপোযোগী স্ট্যাম্প।
সুত্রবলছে, প্রতি সপ্তায় ট্রেজারী শাখায় প্রায় দেড় শতাধিক স্ট্যাম্পের চালান জমা হয়। সে হিসাবে চালান বাবদ ৪০ টাকা হারে মাসে লাখ লাখ টাকা আদায় করছেন করছেন সংশ্লিষ্ট শাখার প্রধান করণিক আব্দুর রউফ। প্রকাশ্যে এ অনৈতিক ঘুষের টাকা আদায় করছেন অফিস সহকারী রাজু। বড় বাবুর নামে তিনি এ টাকা আদায় করে থাকেন।

সুত্র বলছে, প্রতি রিম কাট্রিস পেপারের (ডেমি) দাম ২৫ শ’টাকা। যা বিক্রি করলে ভেন্ডারেরা পায় মাত্র আড়াশ টাকা কমিশন। কিন্তু ওই এক রিম কাট্রিস পেপার তুলে নিতে ট্রেজারী শাখার বড় বাবুকে ঘুষ দিতে হচ্ছে সাড়ে ৪শ’ টাকা। প্রতি রিম ফলিও দাম ১হাজার টাকা। যা বিক্রি করলে ভেন্ডারেরা পায় ৮০ টাকা কমিশন। কিন্তু ওই এক রিম ফলিও বাবদ ঘুষ আদায় করা হচ্ছে ১শ’২০ টাকা। কোট ফি বিক্রি করে ভেন্ডারেরা কমিশন পায় ৯৮ পয়সা। কিন্তু চালান প্রতি ভেন্ডারের ঘুষ দিতে হচ্ছে ৫০ টাকা।

সুত্রবলছে, একজন ভেন্ডার প্রতি সপ্তায় ১৬ হাজার টাকার নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের চালান জমা দিতে পারবে। এর মধ্যে হায়ার ভ্যালু ১০ হাজার টাকা ও লয়ার ভেলু ৬ হাজার টাকা। হায়ার ভেলু নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প বাবদ সদরের ভেন্ডারেরা শতকরা কমিশন পায় দেড় টাকা ও অন্য উপজেলা দুই টাকা। এছাড়া লয়ার ভেল্যু স্ট্যাম্পে সদরের ভেন্ডারেরা কমিশন পায় ৩ টাকা ৬৫ পয়সা ও অন্য উপজেলায় ভেন্ডারেরা পায় ৪ টাকা। সেখানে এই দুই শ্রেণীর চালান বাবদ মোট ৪০ টাকা ট্রেজারী শাখার বড় বাবুকে ঘুষ দিতে হচ্ছে।
শুধু নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পের হায়ার ভ্যালু ও লয়ার ভেলু টোটাল হিসাবে ঘুষে টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে না। এর মধ্যে যদি কেউ ৫ টাকার এক রিম স্ট্যাম্প নিতে চাই তবে রিম প্রতি তাকে আরও ৩শ টাকা বেশি দিতে হয়। একই ভাবে ১০ টাকার ১ রিম স্ট্যাম্প নিতে হলে অতিরিক্ত গুণতে হয় ২০ টাকা। ৫ টাকা ও ১০ টাকার স্ট্যাম্পের বাজারের চাহিদা বেশি থাকায় এ স্ট্যাম্পের ঘুষের রেটও বেশি বলে জানান ভেন্ডারেরা। কোন ভেন্ডার সপ্তায় ১৬ হাজার টাকার বেশি চালান জমা দিলে তাকে আর ১শ টাকা অতিরিক্ত এবং আনুপাতিক হারে ঘুষ দিতে হয়। কোন ভেন্ডার ঘুষ না দিলে বাজারের যে সকল স্ট্যাম্পের চাহিদা কম সেগুলো দেয়া হয়। বাজারের সাধারণত ২০-৩০ও ৪০ টাকার স্ট্যাম্পের চাহিদা কম রয়েছে বলে দাবি করেন স্ট্যাম্প ভেন্ডারেররা।

সুত্রবলছে, ১৮৯৯ সালের নির্ধারিত কমিশনে এখনো স্ট্যাম্প বিক্রি করেন ভেন্ডারেরা। দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতির বাজারে স্বল্প কমিশনে তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে হিমশিম খেতে হয়। তার উপর ট্রেজারী শাখার বড় বাবুর অনৈতিক অর্থ আদায় সব মিলে স্ট্যাম্প ভেন্ডারদের মড়ার উপর খাড়ার ঘা অবস্থা হয়েছে। বাজারের নির্র্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে স্ট্যাম্প বিক্রি করতে হচ্ছে ভেন্ডারদের।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জন স্ট্যাম্প ভেন্ডার জানান, ‘যশোরের ৮টি উপজেলায় ১৯০ জন স্ট্যাম্প ভেন্ডারের কাছ থেকে মাসে লাখ লাখ টাকা ঘুষ নেয়া হচ্ছে। কিন্তু তার কোন প্রতিবাদ নেই। কেউ এ নিয়ে মুখ খুললে বলা হয় স্ট্যাম্প সংকট রয়েছে। তাকে বাধ্যতামুলক যে সকল স্ট্যাম্পের বাজারে চাহিদা কম অর্থাৎ ২০-৩০ও ৪০ টাকার স্ট্যাম্প ধরিয়ে দেয়া হয়। ওই সকল স্ট্যাম্পের বাজারে চাহিদা কম থাকায় ভেন্ডারের তা বেশি নিতে চান না। ঘুষ দিলেই আর সংকট থাকে না। তখন চাহিদা অনুযায়ী স্ট্যাম্প পায় সবাই।’ অপর একজন স্ট্যাম্প ভেন্ডার জানান, ‘স্ট্যাম্প বিক্রি করে ভেন্ডারেরা যে কমিশন পায় তার থেকে কয়েকগুন বেশি টাকা ঘুষ দিতে হয় ট্রেজারী শাখার বড়বাবুকে। এতে তাদের না জাহেল অবস্থা। অতিরিক্ত দামে স্ট্যাম্প বিক্রি করতে গিয়ে ক্রেতাদের কাছে প্রায় ঝামেলায় পড়তে হচ্ছে।’

অভিযোগের বিষয়টি জানতে মুঠোফোনে যোগযোগ করা হলে যশোর ডিসি অফিসের ট্রেজারী শাখার প্রধান করণিক আব্দুর রউফ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘ট্রেজারী শাখায় কোন অনৈতিক ঘুষ আদায় করা হয় না।’
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য যশোরের এনডিসি প্রীতম সাহার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন‘ জরুরী মিটিংয়ে আছি পরে কথা বলবো।’

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।