মুর্শিদাবাদে বাউল-ফকিরদের উপর মোল্লাদের অত্যাচার – ডঃ শক্তিনাথ ঝা, পার্থ দে ও আশিস জানা

     মুর্শিদাবাদ বাংলাদেশ সংলগ্ন জেলা। এখানকার জনসংখ্যার সত্তর ভাগের অধিক মুসলমান। এসমস্ত মুসলমানেরা নানাবিধ ইসলামী ঐতিহ্য অনুসরণ করে এবং মৌলবাদী নয় এমন সমন্বয় পন্থা অনুসরণ করে। বাউলফকির গান অধুনা, আন্তর্জাতিকঅনন্য সংরক্ষণ যোগ্য শিল্প হিসাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী বাউলদের বহু মর্যাদা দিয়েছেন। বাউলেরা জাতবর্ণসম্প্রদায়লিঙ্গ বৈষম্য অগ্রাহ্য করে নিজেদের মানুষ বলে। লালন, দদ্থ হাসান রাজা, হাউড়ে হিন্দু বা মুসলমান বলে নিজেদের পরিচয় দেয়না। বৈদিকশরিয়ত আচার লঙ্ঘন করে তাদের বেশবাস, খাদ্যাখাদ্য, ধর্মসাধন নির্মিত হয়। মির্জা গালিবের মত তারাও বলে, “ My creed is oneness my belif is abandonment of all rituals. Let all communities dissolve and constitute a faith.” ভারত সাগরে নানা পথ মতকে দিয়ে তারা রচনা করে এক মানব বন্ধন। বাউলফকিরেরা দেশজ সংস্কৃতি এবং ভাষাকে মর্যাদা দেয়। সব বর্ণের, ধর্মের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে। আচারবর্জন,সাম্প্রদায়িকতা দিয়ে দেশজাতিকে বিভাক্ত করে, তারা বাউলফকিরদের ধ্বংস করতে যত্ন নেয়। ধর্মাচারের সমালোচক সমন্বয়ী সাধকেরা সেকাল এবং একালের মৌলবাদের চোখের বালি। তাদের ওপর দৈহিক মানসিক নির্যাতন আমাদের সামাজিক ইতিহাসে অপরিচিত তথ্য। হিন্দুমুসলমান সমাজপতিরা লাগাতার বাউল ধ্বংসের আন্দোলন করে থাকেন।

অধুনাইসলামিক স্টেটকথাটা খুবশোনা যায়। সিরিয়া আফগানিস্তানে গণতান্ত্রিক সরকারকে উচ্ছেদ করে ইসলামের শরিয়তের অনুশাসনে রাষ্ট্রগঠনের জন্য মৌলবাদীরা গৃহযুদ্ধ চালাচ্ছে। অন্যদেশে গেরিলা কায়দায় মৌলবাদীরা নাশকতার নামান্তরে গৃহযুদ্ধ শুরু করেছে। এদের রয়েছে দুনিয়া জোড়া প্রকাশ্য গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। বাংলাদেশের মৌলবাদী আন্দোলনের সঙ্গে নানা ভাবে যুক্ত সীমান্ত সংলগ্ন মুর্শিদাবাদের মৌলবাদ।এরা মুসলমান প্রধান এলাকায় শরিয়ত প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঐক্য বদ্ধ করে। বলবত করে তাদের বিচার, আইন, মধ্যজুগিয় প্রথা সমূহ। এমতে, অন্য ধর্মগোষ্ঠীর সঙ্গে সহাবস্থানের স্থান নেই। নেই সমন্বয়ের কোন সূত্র। জোর করে তাদের ব্যাখাত ইসলামকে মানতে বাধ্য করে, তারা গঠন করে শরিয়তি মুক্তাঞ্চল।         মুর্শিদাবাদে লালবাগ থানার ডাঙ্গাপারা গ্রাম পঞ্চায়েতের নতুন হাসানপুর গ্রামের বাউল ফকিরদের ওপর ইতিপূর্বে অত্যাচার হয়েছিল। বয়কট, একঘরে করেও গুরু ফরজুল্লা শেখকে কব্জা করতে পারেনি মৌলবাদ। ইতিমধ্যে গ্রামের দুজন শেভে খৃস্টান ধর্ম গ্রহণ করেছে। ফরজুল্লা শেখের শিষ্য আকবর আলি সেখ, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মী ছিলেন এবং ট্রেড ইউনিয়নের নেতা ছিলেন। তিনি বাউল ফকির সংঘের সম্পাদক। ফরজুল্লা শেখের ছেলে আরুল সেখ বেশরিয়ত বাউল। গত ২৬জুলাই আরুলের মা, আকবরের গুরুমা মারা গেলে, গ্রামের মৌলবাদীরা কব্র দিতে বাধা দেয়। শেষ পর্যন্ত বাউলেরা অল্প কয়েকজন মিলে তাকে সমাধিস্থ করে। এতে যোগ দেওয়ার জন্য ছয়ঘড়ির তিনজনের ছোট ব্যবসা বন্ধ করে দিয়ে মৌলবাদীরা তাদের বাউল মত ত্যাগ করায়। ঈদের আগে (১১সেপ্টেম্বর ২০১৬) আকবর এবং আরুল্কে ডেকে বাউল মত ত্যাগ করতে বলা হয়। কিন্তু তারা না করায় সামাজিক বয়কট করা হয়। কিন্তু বয়কট লাগু হয়না। এপ্রিল মাসে আরুল সেখের স্ত্রী রুমেলা বিবি হাস্পাতাল থেকে ফিরে আসে। আরুলের বাড়িতে দেখাশোনার জন্য কেউ না থাকায় তাকে পিতা ওমর সেখের বাড়িতে রাখা হয়।

মৃত্যু শয্যায় শায়িত রুমেলার সঙ্গে আরুলের দেখা করা নিষিদ্ধ করে মৌলবাদীরা। ওমরের বাড়িতে কোন বাউল গেলে ওমরের দশ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য হয়। মৌলবি নাকি উত্থান রহিত রুমেলাকে কলমা পড়িয়ে তালাক করে দেয়। দুদিন পর রুমেলা মারা যায়। তার কবরে আরুলকে মাটি দিতে দেওয়া হয়না। মৌলবাদীরা উপরন্তু আরুল এবং আকবরকে একঘরেকরে বয়কট কার্যকরী করেছে। ()কেউ তার সঙ্গে কথা বলবে না, ()জমি চাষ করবে না ()দেবেনা সেচের জল অথবা মানুষ ()এমনকি অন্যের জমির ওপর দিয়ে তাদের হাঁটা চলাও বন্ধ। আকবরের সঙ্গে কথা বলার জন্য ওমর শেখকে জরিমানা করা হয়েছে। আকবরের পরিবারের সঙ্গে কথা বলার জন্য হায়দার শেখকে জরিমানা করা হয়েছে। সে জরিমানা না দেওয়ায় তাকে বৃহত্তর শান্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একই নির্দেশ গ্রামের দুটি খৃষ্টান পরিবারের বিরুদ্ধে জারি করা হয়েছে। এভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ ভারতবর্ষে বাউল ফকিরদের ধর্মপালানের মৌলিক অধিকার অগ্রাহ্য করে ইসলামি আইনের মাধ্যমে ঐসলামিক রাষ্ট্রের মুক্তাঞ্চল গঠিত হচ্ছে। হরণ করা হচ্ছে ভারতীয় নাগরিকদের গণতান্ত্রিক অধিকার।এবং নির্মিত হচ্ছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার আঁতুড় ঘর। সমস্ত অত্যাচারের নেতৃত্বে রয়েছেন মৌলবি আবুল হাসান (পিতা রমজান শেখ)খবরে প্রকাশ যে,তার নিকট আত্মীয়ের একাধিকজন জালনোটের ধরা পড়ে এখন জেলে।       মুর্শিদাবাদ জেলার লালবাগ থানার নবগ্রামের আছরা গ্রামে বিদ্যালয় শতবার্ষিকী অনুষ্ঠানে সমীরুদ্দিন সরকার এবং আকবর হোসেনের উদ্যোগে বাংলাদেশের শিল্পীদের গান বন্ধ করে দিয়েছে মৌলবাদীরা (//২০১৭)   রেজিনগর থানার নাজিরপুর আন্দুলবেড়িয়ায় কাদেরিয়া এবং চিস্তিয়া পীরের বহু অনুসারী নিজস্ব দরবার ঘরে বৃহস্পতিবারে স্বরীতিতে নামাজ পড়ে। তারা এদের দুটি দরবার ভেঙ্গে, এক জনকে দিয়ে দরবারে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সম্মতিপত্র লিখিয়েছে। এখানকার জনৈক পীর রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ইসলাম, এবং মাদার টেরেজা সৎ মানুষ হিসেবে বেহেস্ত/ স্বর্গ পাবে বলায়, দরবার ভেঙ্গেছে। উক্ত গ্রামে বাউল সাধক মালেক শেখ গেলে তাকে লাঞ্ছিত করা হয়। কাদেরিয়াদের জেহের শেখের পিতার মৃত্যু হলে মৌলবাদীরা মাটি দিতে বাধা দেয়। গ্রামের অন্য পীর গোলাম মুর্তজাকে নিগ্রহ করা হয়েছে। তবে, সংলগ্ন গ্রামের আব্দুল মান্নান তাদের সংগঠিতকরে প্রতিরোধ করেছে।

এই সংবাদটি শেয়ার করুন

FacebookXLinkedInPinterestWhatsApp
admin
লেখক / প্রতিবেদক

admin

এই প্রতিবেদকের আরও সংবাদ পড়তে নামের উপর ক্লিক করুন।

💬 মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশিত হবে না।