‘পরিবারের সদস্য হওয়া কারো যোগ্যতাও না, অযোগ্যতাও না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যও যদি অনিয়মে জড়িত হন, তবে তাঁরও ছাড় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।’ বললেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য ও কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক।
তিনি বলেন, এবারের সব কটি আসনের উপনির্বাচনে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়টিতে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
জাতীয় সংসদের পাঁচটি আসনের উপনির্বাচনের সব কটিতেই প্রয়াত সংসদ সদস্যদের পরিবারের সদস্যসহ স্বজনরা আওয়ামী লীগের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চেয়েছিলেন। তবে একটি ছাড়া বাকি চারটি আসনেই মনোনয়ন পেয়েছেন প্রয়াত সংসদ সদস্যদের বিরোধী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা।
ক্ষমতাসীন দলটির একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, পরিবারের সদস্যদের অপকর্ম ও বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে ক্ষুব্ধ হয়েই তাঁদের মনোনয়ন না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। গড়ে দুই দশকের বেশি সময় পরে এই প্রার্থী বদলের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের তৃণমূলে অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য যেমন আসবে, তেমনি পারিবারিক আধিপত্য খর্ব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সদস্য মুহাম্মদ ফারুক খান বলেন, ‘প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা, জনপ্রিয়তা, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এবং দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা—এ বিষয়গুলোকে বিবেচনায় নিয়ে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এবার আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে দেখা হয়েছে তা হলো, প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ আছে কি না।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের একজন সদস্য বলেন, ‘আগে মনোনয়নের বেলায় প্রয়াত এমপিদের পরিবার প্রাধান্য পেলেও এবার প্রার্থীদের ভাবমূর্তিকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে প্রার্থীদের নানা বিষয়ে খবর নিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে দীর্ঘদিন পরে কয়েকটি আসনে ক্ষমতার কেন্দ্র বদল হতে যাচ্ছে।’
সম্প্রতি ঢাকা-৫, ঢাকা-১৮, সিরাজগঞ্জ-১, পাবনা-৪ ও নওগাঁ-৬ এই পাঁচটি আসনে উপনির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের সভায় এসব আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা-৫, পাবনা-৪ ও নওগাঁ-৬ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে যথাক্রমে কাজী মনিরুল ইসলাম মনু, নুরুজ্জামান বিশ্বাস ও আনোয়ার হোসেন হেলালকে। বাকি ঢাকা-১৮ ও সিরাজগঞ্জ-১-এর প্রার্থী ঘোষণা না হলেও মনোনয়ন চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের একাধিক নেতা। তাঁরা হলেন যথাক্রমে হাবীব হাসান ও তানভীর শাকিল জয়।
পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী) আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা ২৪ বছর আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছিলেন প্রয়াত ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। গত ২ এপ্রিল তিনি মারা যাওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। এ আসনে মনোনয়ন পেয়েছেন পাবনা জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও ঈশ্বরদী উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুজ্জামান বিশ্বাস। তিনি কয়েক বছর ধরেই ডিলুবিরোধী ভূমিকায় ছিলেন; যদিও ডিলুর স্ত্রী, ছেলে-মেয়েসহ পরিবারের আটজন সদস্য মনোনয়ন চেয়েছিলেন।
সূত্রগুলো জানায়, ডিলুর পরিবারের কারো মনোনয়ন না পাওয়ার কারণ তাঁদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও পারিবারিক কলহ। তাঁদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব চলছে দীর্ঘদিন ধরেন। ডিলুর জীবদ্দশাতেই ছেলে ও মেয়ের জামাইয়ের মধ্যে একাধিক বিবাদের ঘটনা গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়।
কিছুদিন আগে দলীয় মনোনয়ন চেয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে ডিলুর মেয়ে মেহজাবিন শিরিন পিয়া বলেন, ‘আমার মা, ভাই, স্বামী মনোনয়ন প্রত্যাশা করলেও দীর্ঘ ২৬ বছর আমিই বাবার সঙ্গে হাত ধরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় রয়েছি। এখন পরিবারের কেউ মনোনয়ন চাইলে সেটা অন্যায় হবে।’
ডিলুর ছেলে শিরহান শরীফ তমাল ঈশ্বরদী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ছিলেন। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের দায়ে তাঁকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়। বিভিন্ন সময়ে দলীয় নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে মারধর করার অভিযোগ আছে তাঁর বিরুদ্ধে। একটি মামলায় জেলেও গিয়েছিলেন তিনি। ২০১৭ সালের ২৯ নভেম্বর ঈশ্বরদীর রূপপুরে চার সাংবাদিককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগও আছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নওগাঁ-৬ আসনে ২০০৮ সাল থেকে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইসরাফিল আলম। তাঁর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এই আসনের উপনির্বাচনে মনোনয়ন পেয়েছেন রানীনগর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন হেলাল; যদিও এই উপনির্বাচনে ইসরাফিল আলমের স্ত্রী সুলতানা পারভীন মনোনয়ন চেয়েছিলেন।
হেলাল বিগত উপজেলা নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে জয়ী হন। নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে নির্বাচন করায় হেলালকে রানীনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পদ থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেছিল জেলা কমিটি। ইসরাফিল আলমের সঙ্গে তীব্র বিরোধ ছিল তাঁর। আনোয়ার হোসেন হেলাল বলেন, ‘পুরনো ওই সব বিষয় নিয়ে আর ভাবতে চাই না। নির্বাচিত হতে পারলে প্রয়াত সংসদ সদস্যের কাজগুলোকে আমি এগিয়ে নিয়ে যাব।’
রাজধানীর যাত্রাবাড়ী, ডেমরা ও কদমতলী থানার আংশিক এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৫ আসনে ১৯৯৬ সাল থেকে টানা পাঁচবার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান হাবিবুর রহমান মোল্লা। এর মধ্যে চারবার তিনি জয়ী হন। তাঁর মৃত্যুতে শূন্য হওয়া এই আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন মোল্লা পরিবারের বিরোধী হিসেবে পরিচিত যাত্রাবাড়ী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী মনিরুল ইসলাম মনু। আসনটিতে প্রয়াত সংসদ সদস্যের ছেলে ও ডেমরা থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মশিউর রহমান মোল্লা সজল মনোনয়নের দাবিদার ছিলেন। তবে দীর্ঘদিন ধরে মোল্লা পরিবারের আধিপত্যের কারণে কোণঠাসা নেতাদের মূল্যায়ন করতেই মনুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো।
সূত্র মতে, ঢাকা-১৮ আসনে চূড়ান্ত হওয়া আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবীব হাসান একসময় প্রয়াত সংসদ সদস্য সাহারা খাতুনের ঘনিষ্ঠ থাকলেও বেশ কিছুদিন ধরে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য চলছিল। আসনটিতে সাহারা খাতুনের ভাতিজাসহ ৫৬ জন মনোনয়ন ফরম কিনলেও শেষ পর্যন্ত তাঁরা মনোনয়ন পাননি।
সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মোহাম্মদ নাসিম প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা হারালে ডামি প্রার্থী থেকে আওয়ামী লীগের মূল প্রার্থী হয়েছিলেন নাসিম পুত্র তানভীর শাকিল জয় এবং বিপুল ভোটে জয়ীও হয়েছিলেন। পরে বাবার সম্মানে ২০১৪ সালের নির্বাচনে আসনটি ছেড়ে দেন তিনি। এবার এই আসনে প্রয়াত সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন।



